১৪ ফেব্রুয়ারি ভালোবাসা দিবস কেন? এর ইতিহাস কী

১৪ ফেব্রুয়ারি ভালোবাসা দিবস কেন বা ভ্যালেন্টাইনস ডে মূলত সেন্ট ভ্যালেন্টাইন নামের একজন খ্রিস্টান পুরোহিতের স্মৃতিকে ঘিরে পালন করা হয়। রোমান সম্রাট ক্লডিয়াসের সময়ে সৈন্যদের বিয়ে নিষিদ্ধ ছিল, কারণ মনে করা হতো অবিবাহিত সৈন্যরা বেশি শক্তিশালী। কিন্তু ভ্যালেন্টাইন গোপনে প্রেমিক যুগলদের বিয়ে দিতেন। এজন্য তাকে কারাবন্দি করে ১৪ ফেব্রুয়ারি মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। তার আত্মত্যাগের স্মরণে দিনটি ভালোবাসার প্রতীক হয়ে ওঠে। ধীরে ধীরে এটি বিশ্বজুড়ে প্রেম, বন্ধুত্ব ও সম্পর্কের অনুভূতি প্রকাশের দিনে পরিণত হয়েছে, যেখানে মানুষ প্রিয়জনকে শুভেচ্ছা, উপহার ও ভালোবাসা জানায়।

১৪ ফেব্রুয়ারি ভালোবাসা দিবস কেন? এর ইতিহাস 

১৪ ফেব্রুয়ারি বা ভ্যালেন্টাইনস ডে এখন বিশ্বজুড়ে প্রেমের উৎসব হিসেবে পালিত হলেও, এর পেছনের ইতিহাস বেশ প্রাচীন এবং কিছুটা রক্তক্ষয়ী। এটি মূলত রোমান ইতিহাস, খ্রিস্টীয় ধর্মতত্ত্ব এবং লোকগাঁথার সংমিশ্রণ।

ভালোবাসা দিবসের কেন্দ্রে রয়েছেন সেন্ট ভ্যালেন্টাইন, তবে ইতিহাসবিদদের মতে এই নামে একাধিক ব্যক্তি থাকতে পারেন। সবচেয়ে জনপ্রিয় গল্পটি হলো রোমান যাজক সেন্ট ভ্যালেন্টাইনকে নিয়ে।

ঘটনাটি ছিল এমন:

২৬৯ সালে ইতালির রোম নগরীতে সেন্ট ভ্যালেন্টাইন নামে একজন খ্রিস্টান পাদ্রী ও চিকিৎসক ছিলেন। ধর্ম প্রচারের অভিযোগে নয়,বরং অনেকের সাথে অবৈধ শারীরিক সম্পর্কের অভিযোগে তৎকালীন রোম সম্রাট দ্বিতীয় ক্রাডিয়াস তাকে বন্দী করেন। কারণ তখন রোমান সাম্রাজ্যে খ্রিস্টান ধর্ম প্রচার নিষিদ্ধ ছিল,আর নৈতিকতার অবক্ষয়ও রোধ করা প্রয়োজন ছিল। বন্দী অবস্থায় তিনি জনৈক কারারক্ষীর দৃষ্টিহীন মেয়েকে চিকিৎসার মাধ্যমে সুস্থ করে তোলেন। এর পেছনে কালো সত্যি আরো ভয়াবহ,সেই অন্ধ মেয়েকেও ইনি অবৈধ সম্পর্ক ছাড়া ছাড়েন না।

সেন্ট ভ্যালেন্টাইনের জনপ্রিয়তা বেড়ে যায়। আর তাই তার প্রতি ঈর্ষান্বিত হয়ে রাজা তাকে মৃত্যুদণ্ড দেন। সেই দিন ১৪ই ফেব্রুয়ারি ছিল। অতঃপর ৪৯৬ সালে পোপ সেন্ট জেলাসিউও ১ম জুলিয়াস ভ্যালেন্টাইন স্মরণে ১৪ই ফেব্রুয়ারিকে ভ্যালেন্টাইন’ দিবস ঘোষণা করেন। খ্রিস্টান জগতে পাদ্রী-সাধু সন্তানদের স্মরণ ও কর্মের জন্য এ ধরনের অনেক দিবস রয়েছে। যেমন: ২৩ এপ্রিল – সেন্ট জজ দিবস, ১১ নভেম্বর – সেন্ট মার্টিন দিবস, ২৪ আগস্ট – সেন্ট বার্থোলোমিজম দিবস, ১ নভেম্বর – আল সেইন্টম দিবস, ৩০ নভেম্বর – সেন্ট এন্ড্রু দিবস, ১৭ মার্চ – সেন্ট প্যাট্রিক দিবস।

See More  পরিশ্রম সৌভাগ্যের প্রসূতি ভাবসম্প্রসারণ ৯ম, ১০ম শ্রেণি 2026

পাশ্চাত্যের ক্ষেত্রে জন্মদিনের উৎসব, ধর্মোৎসব সবক্ষেত্রেই ভোগের বিষয়টি মুখ্য। তাই গির্জা অভ্যন্তরেও মদ্যপানে তারা কসুর করে না। খ্রিস্টীয় এই ভ্যালেন্টাইন দিবসের চেতনা বিনষ্ট হওয়ায় ১৭৭৬ সালে ফ্রান্স সরকার কর্তৃক ভ্যালেইটাইন উৎসব নিষিদ্ধ করা হয়। ইংল্যান্ডে ক্ষমতাসীন পিউরিটানরাও একসময় প্রশাসনিকভাবে এ দিবস উদ্‌যাপন নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। এছাড়া অস্ট্রিয়া, হাঙ্গেরি ও জার্মানিতে বিভিন্ন সময়ে এ দিবস প্রত্যাখ্যাত হয়।

সম্প্রতি পাকিস্তানেও ২০১৭ সালে ইসলামবিরোধী হওয়ায় ভ্যালেন্টাইন উৎসব নিষিদ্ধ করে সেদেশের আদালত। বর্তমানকালে, পাশ্চাত্যে এ উৎসব মহাসমারোহে উদ্‌যাপন করা হয়। যুক্তরাজ্যে মোট জনসংখ্যার অর্ধেক প্রায় ১০০ কোটি পাউন্ড ব্যয় করে এই ভালোবাসা দিবসের জন্য কার্ড, ফুল, চকোলেট, অন্যান্য উপহারসামগ্রী ও শুভেচ্ছা কার্ড ক্রয় করে এবং আনুমানিক প্রায় ২.৫ কোটি শুভেচ্ছা কার্ড আদান-প্রদান করা হয়।

‘ফ্রম ইওর ভ্যালেন্টাইন’ এর উৎস

কিংবদন্তি আছে যে, জেলে থাকাকালীন ভ্যালেন্টাইন জেলারের অন্ধ মেয়ের চিকিৎসা করেন এবং তার দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দেন। মৃত্যুর আগে তিনি মেয়েটিকে একটি চিঠি লিখে যান, যেখানে স্বাক্ষর করেছিলেন ফ্রম ইওর ভ্যালেন্টাইন (তোমার ভ্যালেন্টাইনের পক্ষ থেকে)। ধারণা করা হয়, ১৪ ফেব্রুয়ারি তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছিল, যা থেকেই দিনটির সূচনা।

২. লুপারকালিয়া উৎসব: প্রাচীন রোমান সংযোগ

অনেকে মনে করেন, খ্রিস্টান চার্চ প্রাচীন প্যাগান বা পৌত্তলিক উৎসব লুপারকালিয়া (Lupercalia)-কে প্রতিস্থাপন করার জন্য ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে এই দিবসটি নির্ধারণ করে।

  • লুপারকালিয়া কী ছিল? এটি ছিল প্রাচীন রোমের একটি উর্বরতা উৎসব, যা ১৩ থেকে ১৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত পালিত হতো।

  • রীতি: এই উৎসবে পুরুষরা লটারির মাধ্যমে নারীদের নাম তুলতেন এবং উৎসব চলাকালীন তারা সঙ্গী হিসেবে থাকতেন। অনেক সময় এই সম্পর্ক বিয়ে পর্যন্ত গড়াত।

পঞ্চম শতাব্দীর শেষের দিকে পোপ গেলাসিয়াস লুপারকালিয়া উৎসব নিষিদ্ধ করেন এবং ১৪ ফেব্রুয়ারিকে সেন্ট ভ্যালেন্টাইনস ডে হিসেবে ঘোষণা করেন।

See More  সোনার তরী কবিতার সৃজনশীল প্রশ্ন ও উত্তর ১০০% কমন

৩. রোমান্টিক রূপান্তর: চসার ও মধ্যযুগ

মধ্যযুগের আগে ভ্যালেন্টাইনস ডে-র সাথে প্রেমের সরাসরি সংযোগ খুব একটা ছিল না। ১৪শ শতাব্দীতে ইংরেজ কবি জেফ্রি চসার তার কবিতায় প্রথম এই দিনটিকে পাখির মিলন এবং রোমান্টিক ভালোবাসার সাথে যুক্ত করেন। সেই সময় থেকে ইউরোপে দিনটি প্রেমিক-প্রেমিকাদের মধ্যে কার্ড বা উপহার বিনিময়ের মাধ্যমে জনপ্রিয় হতে শুরু করে।

৪. আধুনিক ভালোবাসা দিবস

১৮শ শতাব্দীর দিকে ইংল্যান্ডে এই দিনটি বড় আকারে রূপ নেয়। শিল্প বিপ্লবের পর হাতে লেখা চিঠির বদলে ছাপানো কার্ডের প্রচলন শুরু হয়।

  • কার্ডের প্রচলন: ১৮৪০-এর দশকে এস্থার হাওল্যান্ড আমেরিকায় প্রথম বাণিজ্যিকভাবে ভ্যালেন্টাইন কার্ড বিক্রি শুরু করেন, যা তাকে ‘মাদার অফ দ্য ভ্যালেন্টাইন’ খেতাব এনে দেয়।

  • বর্তমান রূপ: বর্তমানে এটি কেবল কার্ড বা ফুলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি এখন বিশ্বজুড়ে কয়েক বিলিয়ন ডলারের একটি ব্যবসায়িক উৎসবে পরিণত হয়েছে, যেখানে মানুষ উপহার, চকোলেট এবং ভ্রমণের মাধ্যমে ভালোবাসা প্রকাশ করে।

ভালোবাসা দিবসের সপ্তাহের সূচি

বর্তমান সময়ে কেবল ১৪ ফেব্রুয়ারি নয়, বরং ৭ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু করে পুরো সপ্তাহজুড়েই বিভিন্ন দিবস পালিত হয়:

তারিখ বিশেষ দিন
৭ ফেব্রুয়ারি রোজ ডে (Rose Day)
৮ ফেব্রুয়ারি প্রপোজ ডে (Propose Day)
৯ ফেব্রুয়ারি চকোলেট ডে (Chocolate Day)
১০ ফেব্রুয়ারি টেডি ডে (Teddy Day)
১১ ফেব্রুয়ারি প্রমিজ ডে (Promise Day)
১২ ফেব্রুয়ারি হাগ ডে (Hug Day)
১৩ ফেব্রুয়ারি কিস ডে (Kiss Day)
১৪ ফেব্রুয়ারি ভ্যালেন্টাইনস ডে

সংক্ষেপে বলতে গেলে, এটি ত্যাগের এক প্রাচীন ইতিহাস থেকে শুরু হয়ে সময়ের বিবর্তনে আজকের রঙিন উৎসবে পরিণত হয়েছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *