পোস্টমাস্টার গল্পের মূলভাব ও বড় প্রশ্নের উত্তর

পোস্টমাস্টার গল্পের মূলভাব মানবিক সম্পর্কের আন্তরিকতা ও একাকীত্বের মধ্যে এক গভীর সংযোগ। গল্পের কেন্দ্রবিন্দু হলো এক পোষ্টমাস্টার, যে গ্রামের একাকী জীবনে বিচ্ছিন্ন।

তার জীবনের একমাত্র সঙ্গী হয়ে ওঠে ছোট্ট মেয়েটি, রত্না, যে সহজ-সরলভাবে তাকে ভালোবাসে। মেয়েটির মৃত্যুর পর পোষ্টমাস্টার একাকী অনুভব করে, কিন্তু এই সম্পর্ক তাকে জীবনের এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গি দেয়। গল্পটি মানবিকতা, সম্পর্কের গুরুত্ব, একাকীত্ব ও ভালোবাসার গভীরতা নিয়ে চিন্তা করতে উদ্ভুদ্ধ করে, যেখানে জীবনের ছোট ছোট সম্পর্কও বৃহত্তর অর্থ বহন করে।

পোস্টমাস্টার গল্পের মূলভাব

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘পোস্টমাস্টার’ ছোটগল্পটি মূলত মানুষের হৃদয়ের বিচিত্র টানাপোড়েন, নিঃসঙ্গতা এবং শেষ পর্যন্ত এক বুক হাহাকার নিয়ে লেখা। এই গল্পের মূলভাবটি কয়েকটি দিক থেকে বিশ্লেষণ করা যায়:

১. শহর বনাম গ্রাম এবং নিঃসঙ্গতা

গল্পের কেন্দ্রবিন্দুতে আছেন কলকাতার এক শিক্ষিত যুবক, যিনি কাজের প্রয়োজনে অজপাড়াগাঁ উলপুরে পোস্টমাস্টার হয়ে এসেছেন। শহরের কোলাহলে অভ্যস্ত লোকটির কাছে গ্রামের নিস্তব্ধ প্রকৃতি কোনো প্রশান্তি আনতে পারেনি, বরং এক তীব্র একাকীত্ব তাকে ঘিরে ধরেছিল। এই পরিবেশগত দূরত্ব থেকেই গল্পের মানসিক দূরত্বের শুরু।

২. সম্পর্কের মায়া ও অসম সামাজিক অবস্থান

পোস্টমাস্টার এবং অনাথ বালিকা রতনের মধ্যে কোনো রক্তের সম্পর্ক ছিল না। কিন্তু রতন তার সেবার মধ্য দিয়ে পোস্টমাস্টারকে নিজের ‘দাদা’ হিসেবে মনে মনে স্থান দিয়েছিল। অন্যদিকে, পোস্টমাস্টারের কাছে রতন ছিল কেবল নিঃসঙ্গতা কাটানোর এবং কাজ করিয়ে নেওয়ার একটি অবলম্বন। এখানে রতনের ভালোবাসা ছিল নিঃস্বার্থ এবং গভীর, আর পোস্টমাস্টারের আচরণ ছিল সাময়িক ও আলগা।

৩. বাস্তব বনাম আবেগ

গল্পের শেষ পর্যায়ে যখন পোস্টমাস্টার বদলি হয়ে চলে যান, তখন রতন ব্যাকুল হয়ে তাকে সঙ্গে নিয়ে যাওয়ার অনুরোধ জানায়। কিন্তু পোস্টমাস্টারের কাছে এটি ছিল অবাস্তব এবং হাস্যকর এক প্রস্তাব। পোস্টমাস্টার যুক্তিবাদী ও বাস্তববাদী মানুষের প্রতিনিধিত্ব করেন, যে সহজেই মায়ার বাঁধন ছিঁড়ে চলে যেতে পারে। অন্যদিকে রতন সেই চিরন্তন সরল প্রাণের প্রতীক, যে বিচ্ছেদের বেদনা সারা জীবন বয়ে বেড়ায়।

See More  NCTB ৮ম শ্রেণির বই PDF ২০২৬ সালের বই || Class 8 Book PDF 2026

৪. মানুষের চিরস্থায়ী ভ্রান্তি

গল্পের শেষ লাইনে রবীন্দ্রনাথ চমৎকারভাবে বলেছেন, মানুষের মন সহজে সত্যকে মানতে চায় না। বিচ্ছেদের সময় পোস্টমাস্টারের মনে সাময়িক দুঃখ হলেও তিনি নিজেকে এই বলে সান্ত্বনা দেন যে “পৃথিবীতে কে কাহার?” কিন্তু রতন সেই দর্শন বোঝেনি। সে এক বুক আশা নিয়ে পোস্টমাস্টারের ফেরার অপেক্ষায় পথ চেয়ে থাকে।

সহজ কথায় মূলভাব: ‘পোস্টমাস্টার’ গল্পের মূল কথা হলো মানুষের সম্পর্কের অনিশ্চয়তা এবং বিচ্ছেদের অনিবার্য করুণ রস। এটি আমাদের দেখায় যে, একজনের কাছে যা সামান্য ক্ষণের পরিচয় বা সময়ের প্রয়োজনে তৈরি হওয়া সম্পর্ক, অন্যজনের কাছে তা-ই জীবনের চরম সত্য বা বাঁচার অবলম্বন হয়ে দাঁড়াতে পারে।

পোস্টমাস্টার গল্পের বড় প্রশ্নের উত্তর 

১. ‘পোস্টমাস্টার’ গল্পের নামকরণের সার্থকতা আলোচনা করো।

উত্তর: সাহিত্যের নামকরণের ক্ষেত্রে সাধারণত বিষয়বস্তু বা প্রধান চরিত্রকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। এই গল্পের নাম ‘পোস্টমাস্টার’ রাখা হয়েছে প্রধান চরিত্রের পদবি অনুযায়ী। গল্পের পুরো কাহিনী আবর্তিত হয়েছে শহর থেকে আসা এই চাকরিজীবী যুবককে কেন্দ্র করে। তার নিঃসঙ্গতা, রতনের সাথে তার পরিচয়, অসুস্থতায় রতনের সেবা এবং সবশেষে তার চলে যাওয়া সবকিছুর মূল বিন্দু তিনিই। যদিও রতনের চরিত্রটি এখানে অনেক বেশি আবেগপ্রবণ, তবুও পোস্টমাস্টারের সিদ্ধান্তই গল্পের ক্লাইম্যাক্স বা সমাপ্তি নির্ধারণ করে। তাই পেশাগত পরিচয়ে গল্পটির নামকরণ যথাযথ হয়েছে।

২. রতন ও পোস্টমাস্টারের সম্পর্কের স্বরূপ বিশ্লেষণ করো।

উত্তর: তাদের সম্পর্ক ছিল অদ্ভুত এক সমীকরণের। একদিকে ছিল শিক্ষিত, শহরমুখী এক যুবক, আর অন্যদিকে গ্রামের এক অনাথ বালিকা। পোস্টমাস্টারের কাছে রতন ছিল একাকীত্ব কাটানোর মাধ্যম এবং ঘরের কাজ করে দেওয়ার সহায়িকা। তিনি তাকে নিজের অবসরে পড়ালেখা শেখাতেন এবং ঘরের কথা বলে সময় কাটাতেন। কিন্তু রতনের কাছে এই সম্পর্ক ছিল অনেক গভীর। সে পোস্টমাস্টারের মধ্যে তার হারানো পরিবার বা বড় দাদাকে খুঁজে পেয়েছিল। পোস্টমাস্টারের কাছে যা ছিল সাময়িক সান্নিধ্য, রতনের কাছে তা ছিল সারা জীবনের অবলম্বন।

See More  2026 শিক্ষাবর্ষের ৫ম শ্রেণির বই pdf || Class 5 Book PDF ডাউনলোড করুন

৩. “পৃথিবীতে কে কাহার?” উক্তিটি কার এবং কোন প্রসঙ্গে বলা হয়েছে? এর তাৎপর্য কী?

উত্তর: উক্তিটি পোস্টমাস্টারের। গল্পের শেষে যখন তিনি উলপুর গ্রাম ছেড়ে নৌকায় করে চলে যাচ্ছিলেন, তখন রতনের করুণ মুখচ্ছবি এবং কান্নার কথা ভেবে তার মন কিছুটা বিষণ্ন হয়ে পড়ে। সেই সময় নিজেকে সান্ত্বনা দিতে তিনি এই দর্শনের আশ্রয় নেন। তাৎপর্য: এটি একটি জীবনমুখী দর্শন হলেও এখানে পোস্টমাস্টারের মানসিক পলায়নপরতা ফুটে উঠেছে। তিনি নিজের অপরাধবোধ বা কষ্ট থেকে বাঁচতে ভাবেন যে জগতে কেউ কারো নয়, সবকিছুই ক্ষণস্থায়ী। অথচ রতন এই দর্শন বোঝেনি, সে তার সরল বিশ্বাস আর ভালোবাসা নিয়ে পোস্টমাস্টারের ফেরার অপেক্ষায় ছিল।

৪. রতন চরিত্রটি গল্পের মূল আবেদনকে কীভাবে সার্থকতা দিয়েছে?

উত্তর: রতন এই গল্পের প্রাণ। সে নিঃস্বার্থ ভালোবাসা এবং চরম ত্যাগের প্রতীক। পোস্টমাস্টার যখন অসুস্থ হয়ে পড়েন, রতন পরম মমতায় মায়ের মতো তার সেবা করে। তার ছোট ছোট ইচ্ছা এবং পোস্টমাস্টারের চলে যাওয়ার খবরে তার ব্যাকুলতা পাঠকদের চোখে জল আনে। গল্পের শেষে পোস্টমাস্টার যখন তাকে কিছু টাকা দিতে চান, রতন তা গ্রহণ না করে কেঁদে বলে, “দাদাবাবু, তোমার দুটি পায়ে পড়ি, আমাকে কিছু দিতে হবে না।” এই একটি বাক্যেই রতনের চরিত্রের মহত্ত্ব এবং গল্পের করুণ রস চূড়ান্ত রূপ পেয়েছে।

৫. গল্পে ‘প্রকৃতি’ এবং ‘নিঃসঙ্গতা’ কীভাবে ফুটে উঠেছে?

উত্তর: গল্পের শুরু থেকেই উলপুরের প্রকৃতিকে পোস্টমাস্টারের কাছে একঘেয়ে এবং বিরক্তির কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছে। শহরের কোলাহলে অভ্যস্ত মানুষের কাছে গ্রামের বর্ষা বা নিস্তব্ধতা ভীতিকর হয়ে ওঠে। এই বাহ্যিক নিঃসঙ্গতা কাটাতে গিয়েই তিনি রতনের সান্নিধ্য খোঁজেন। আবার গল্পের শেষে যখন তিনি চলে যাচ্ছেন, তখন নদী এবং বাতাসের শব্দ যেন রতনের কান্নার সুর হয়েই বেজে উঠছিল। অর্থাৎ, প্রকৃতি এখানে পোস্টমাস্টারের একাকীত্ব এবং রতনের বিচ্ছেদ বেদনাকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *