লালসালু উপন্যাসের মূলভাব হলো ধর্মীয় ভণ্ডামি, অজ্ঞতা এবং গ্রামীণ সমাজে কুসংস্কারের প্রভাব তুলে ধরা। লেখক সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ দেখিয়েছেন কীভাবে মজিদ নামের এক চতুর ব্যক্তি ধর্মকে ব্যবহার করে সাধারণ মানুষকে ভয় দেখিয়ে নিজের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করে।
গ্রামের মানুষ অন্ধ বিশ্বাসে তাকে অনুসরণ করে, সত্য যাচাই করার চেষ্টা করে না। এতে বোঝা যায়, শিক্ষার অভাব মানুষকে সহজেই প্রতারণার শিকার করে তোলে। উপন্যাসটি সমাজের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে এবং সচেতন হওয়ার বার্তা দেয়। ধর্মের আসল মূল্যবোধ নয়, বরং স্বার্থের জন্য এর অপব্যবহারই এখানে সবচেয়ে বড় সমালোচনার বিষয়।
HSC লালসালু উপন্যাসের মূলভাব
উপন্যাসটির মূল ভিত্তি গড়ে উঠেছে মজিদ নামের এক চতুর ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে। মজিদ এমন এক অঞ্চল থেকে এসেছে যেখানে জমি নেই, আছে শুধু ক্ষুধা। এই ক্ষুধার তাড়নায় সে মহব্বতপুর গ্রামে এসে একটি পরিত্যক্ত পুরোনো কবরকে ‘মোদাচ্ছের পীরের মাজার’ হিসেবে ঘোষণা করে। এখান থেকেই শুরু হয় তার মিথ্যার রাজত্ব।
মজিদ গ্রামের মানুষকে ধর্মের ভয় দেখিয়ে নিজের বশে আনে। সে সাধারণ ও অশিক্ষিত গ্রামবাসীকে বিশ্বাস করায় যে, মাজারের সেবা করলেই তাদের ইহকাল ও পরকাল রক্ষা পাবে। এখানে ধর্ম কোনো আধ্যাত্মিক শান্তির বিষয় নয়, বরং মজিদের কাছে এটি উপার্জনের একটি লাভজনক ব্যবসা। সে সুকৌশলে মানুষের মনে খোদার গজবের ভয় ঢুকিয়ে দেয়, যাতে কেউ তার ক্ষমতার বিরুদ্ধে কথা বলতে সাহস না পায়।
মজিদ একা নয়, সে গ্রামের প্রভাবশালী মাতব্বর খালেক ব্যাপারীর সঙ্গে একটি সখ্য গড়ে তোলে। তারা দুজন মিলে গ্রামকে নিয়ন্ত্রণ করে একজন ধর্মের নামে, অন্যজন লাঠির জোরে। এই শোষণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাধারণ কৃষকরা। মজিদের এই ক্ষমতার পথে বড় বাধা হয়ে আসে আধুনিক শিক্ষা (আক্কাছ আলী) কিংবা নারীত্বের তেজ (জামিলা)। কিন্তু মজিদ অত্যন্ত চতুরতার সঙ্গে ধর্মের দোহাই দিয়ে তাদের কণ্ঠরোধ করে।
উপন্যাসের গভীরে তাকালে দেখা যায়, মজিদের এই ভণ্ডামি আসলে তার টিকে থাকার সংগ্রাম। শস্যহীন এলাকা থেকে আসা একজন মানুষের কাছে এই মাজারটিই বেঁচে থাকার একমাত্র আশ্রয়। মাজারের অস্তিত্ব বিপন্ন হলে তার নিজের অস্তিত্বও ধূলিসাৎ হয়ে যাবে। উপন্যাসের শেষে বন্যার সময় যখন মাজার ডুবে যাওয়ার উপক্রম হয়, তখন মজিদের ভয় আর মরিয়া মনোভাব থেকে বোঝা যায় যে, তার পুরো জীবনটাই একটা ঠুনকো মিথ্যার ওপর দাঁড়িয়ে ছিল।
লালসালু আমাদের শেখায় যে, কুসংস্কার এবং শিক্ষার অভাব থাকলে সমাজ কীভাবে ভণ্ডদের হাতে জিম্মি হয়ে পড়ে। মজিদ কোনো ব্যক্তি নয়, বরং ধর্মকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা এক শ্রেণির শোষকের প্রতীক। লেখক দেখিয়েছেন, লাল কাপড়ে ঢাকা মাজারটি আসলে মানুষের অন্ধত্ব আর ভণ্ডামির এক বিশাল কারাগার।
লালসালু উপন্যাসের মূলভাব
১. ধর্ম ব্যবসা ও ভণ্ডামি
উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র মজিদ। সে অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদে মহব্বতপুর গ্রামে এসে একটি পরিত্যক্ত কবরকে ‘মোদাচ্ছের পীরের মাজার’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। আসলে সেই কবরে কে শুয়ে আছে তা কেউ জানে না। মজিদ ধর্মের দোহাই দিয়ে গ্রামের মানুষকে ভয় দেখায় এবং নিজের আধিপত্য বিস্তার করে। এখানে ধর্ম আধ্যাত্মিক মুক্তির পথ নয়, বরং উপার্জনের হাতিয়ার।
২. ভয়-ভক্তি
মজিদ গ্রামের মানুষকে ভক্তি দিয়ে নয়, বরং ভয়ের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করে। সে গ্রামবাসীকে বোঝায় যে মাজারের প্রতি যথাযথ সম্মান না দেখালে খোদার গজব পড়বে। এই ভয়ের সংস্কৃতি সাধারণ মানুষের বিচারবুদ্ধিকে লোপ করে দেয়, ফলে তারা মজিদের সব অন্যায় নির্দেশ মুখ বুজে মেনে নেয়।
৩. গ্রামীণ ক্ষমতার রাজনীতি
লালসালু শুধু ধর্মের গল্প নয়, এটি ক্ষমতার লড়াইয়ের গল্পও বটে। গ্রামের মাতব্বর খালেক ব্যাপারীর সঙ্গে মজিদ এক ধরনের অলিখিত চুক্তি করে নেয়। খালেক ব্যাপারী মজিদকে সামাজিক বৈধতা দেয়, আর মজিদ তার ধর্মীয় ফতোয়া দিয়ে খালেক ব্যাপারীর শাসনকে নিরঙ্কুশ করে। এর ফলে সাধারণ কৃষক ও দরিদ্র মানুষ দ্বিমুখী শোষণের শিকার হয়।
৪. নারীর অবস্থান ও অবদমন
উপন্যাসে রহিমা ও জামিলা মজিদের দুই স্ত্রীর মাধ্যমে তৎকালীন সমাজে নারীর করুণ চিত্র ফুটে উঠেছে। রহিমা মজিদের অনুগত এবং মাজারের ভয়ে তটস্থ। অন্যদিকে, জামিলা কিশোরী সুলভ চঞ্চলতা ও অবাধ্যতার প্রতীক। মজিদ যখন জামিলাকে বশে আনতে পারে না, তখন সে ধর্মের দোহাই দিয়ে তাকে মাজারে বেঁধে রেখে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করে। এটি মূলত পিতৃতান্ত্রিক সমাজের শোষণেরই একটি রূপ।
৫. অস্তিত্বের লড়াই
মজিদ কিন্তু জন্মগতভাবে শয়তান নয়। সে “শস্যহীন জনপদের” মানুষ, যেখানে ক্ষুধা আর দারিদ্র্য নিত্যসঙ্গী। নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্যই সে মিথ্যার আশ্রয় নেয়। উপন্যাসের শেষে যখন মহাবন্যা আসে এবং মাজার ডুবে যাওয়ার উপক্রম হয়, তখন দেখা যায় মজিদ তার সাজানো সাম্রাজ্য হারানোর ভয়ে অস্থির। তার এই টিকে থাকার লড়াইটা যেমন নিষ্ঠুর, তেমনি বাস্তবসম্মত।

