পবিত্র শবে বরাত সম্পর্কে কোরআনের আয়াত 2026

শবে বরাত সম্পর্কে কোরআনের আয়াত সরাসরি উল্লেখ নেই। তবে অনেক আলেম সূরা দুখান-এর ৩ ও ৪ নম্বর আয়াতের সাথে এ রাতের সম্পর্ক আলোচনা করেছেন। সেখানে বলা হয়েছে, “আমি তা অবতীর্ণ করেছি এক বরকতময় রাতে; নিশ্চয়ই আমি সতর্ককারী। সে রাতে সব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্থির করা হয়।” একদল মুফাসসির মনে করেন, এই বরকতময় রাত শবে বরাত, যেখানে আল্লাহ তায়ালা বান্দার রিজিক, জীবন-মৃত্যু ও তাকদিরের কিছু বিষয় নির্ধারণ করেন। আবার অন্য আলেমরা বলেন, এটি লাইলাতুল কদর। তাই বিষয়টি মতভেদপূর্ণ হলেও, এই রাত ইবাদত ও আত্মশুদ্ধির জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে গণ্য করা হয়।

শবে বরাত সম্পর্কে কোরআনের আয়াত

শা’বান মাসের ১৪ তারিখ দিবাগত রজনী’ শবে বরাত” নামে পরিচিত। ফারসি ‘শব’ শব্দের অর্থ রাত এবং ‘বরাত’ শব্দের অর্থ সৌভাগ্য।
আরবিতে বলে ‘লাইলাতুল বরাত’, অর্থাৎ সৌভাগ্যের রজনী। একটি অভিযোগ শবে বরাত কুরআন ও হাদীসের কোথাও নেই।

এ কথার জবাব হল, কুরআন ও হাদিসের কোথাও শবে বরাত থাকবে কেন, শবে বরাত কুরআন ও হাদীসের পরিভাষা নয়। যেমন :নামাজ, রোযা, ফেরেস্তা এগুলো কুরআন ও হাদিসের পরিভাষা নয়। কুরআনে ‘লাইলাতুম মুবারকা’। হাদিসে ‘লাইলাতুন নিসফী মিন শা’বান’। পবিত্র কোরআন ও প্রসিদ্ধ তাফসীরের আলোকে শবে বরাত

আল্লাহ এরশাদ করেন-

হা-মীম, এ স্পষ্ট কিতাবের শপথ! নিশ্চয়ই আমি তা বরকতময় রাতে অবতীর্ণ করেছি। নিশ্চয়ই আমি সতর্ককারী। এ রাতে বন্টন করে দেওয়া হয় প্রত্যেক হিকমতের কাজ। (সূরা দুখান, আয়াত নং ১-৪)

এ আয়াতের তাফসীর সম্পর্কে বিশ্ব বরেণ্য মুফাস্সিরগণের মতামতঃ

১.মালেকী মাযহাবের আল্লামা শেখ আহমদ ছাভী বলেন- ঐ বরকতময় রজনী হচ্ছে অর্ধ শাবানের রাত্রি (মোফাসসিরীনে কেরামের অন্যতম মোফাসসির) বিশিষ্ট তাবেয়ী হযরত ইকরামা (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু)ও অন্যান্য তাফসীরকারকদের একদলের অভিমত। তারা এর কয়েকটি কারণও উল্লেখ করেছেন।

শাবানের চৌদ্দ তারিখের দিবাগত রাত্রির চারটি নামে নামকরণ করেছেন। যেমন-
১। লাইলাতুম মুবারাকাহ- বরকতময় রজনী।
২। লাইলাতুল বারাআত- মুক্তি বা নাজাতের রাত্রি।
৩। লাইলাতুর রহমাহ- রহমতের রাত্রি।
৪। লাইলাতুছ ছাক- সনদপ্রাপ্তির রাত্রি ইত্যাদি। (তাফসীরে ছাভী, খন্ড-৪, পৃষ্ঠা-৪০)

২.তাফসীরে জালালাইন শরীফে রয়েছে-নিশ্চয়ই আমি তা বরকতময় রাতে অবতীর্ণ করেছি। আর বরকতময় রাত হল লাইলাতুল ক্বদর (ক্বদরের রাত) অথবা লাইলাতুন নিসফি মিন শাবান (শাবানের মধ্য রাত তথা শবে বরাত)। কেননা এই রাতে উম্মুল কিতাব (কোরআন শরীফ) ৭ম আসমান থেকে দুনিয়ার আসমানে (১ম আসমান) নাযিল হয়েছে। নিশ্চয়ই আমি সতর্ককারী।(তাফসীরে জালালাইন শরীফ ৪১০ পৃষ্ঠায়)

৩.তাফসীরে তাবারী শরীফে রয়েছে- আল্লাহ তায়ালার বাণী এর তাফসীরে বিশিষ্ট তাবেয়ী হযরত ইকরামা (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, মধ্য শাবানের রাত্রিতে বছরের সকল ব্যাপার চ‚ড়ান্ত করা হয়, জীবিত ও মৃতদের তালিকা লেখা হয় এবং হাজীদের তালিকা তৈরি করা হয়। এ তালিকা থেকে একজনও কমবেশি হয় না।(তাফসীরে তাবারী শরীফ, পৃষ্ঠা ২২, খন্ড ১০)

See More  পোস্টমাস্টার গল্পের মূলভাব ও বড় প্রশ্নের উত্তর

৪. প্রসিদ্ধ তাফসীরে কুরতুবী রয়েছে- ইমাম কুরতুবী (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু)বলেন, এ রাতের ৪ টি নাম আছে- (ক). লাইলাতুম মুবারাকা, (খ). লাইলাতুল বারাআত, (গ). লাইলাতুছ্ ছাক (ঘ). লাইলাতুন নিসফি মিন শাবান। (তাফসীরে কুরতুবী, খন্ড-১৬ পৃষ্ঠা-১২৬)

৫.তাফসীরে বাগভী শরীফে বর্ণিত আছে- নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ শবে বরাতের রাতে সকল বিষয়ের চ‚ড়ান্ত ফয়সালা করেন এবং শবে ক্বদরের রাতে তা সংশ্লিষ্ট দায়িত্ববান ফেরেশতাদের কাছে ন্যস্ত করেন । (তাফসীরে বাগভী, খন্ড-৭, পৃষ্ঠা ২২৮)
এ রকম ৬৫ টি তাফসীর গ্রন্থে লাইলাতুম মোবারাকা বলতে শবে ক্বদরের পাশাপাশি মধ্য শাবান অর্থাৎ ১৪ শাবানের রাতের কথাও গুরুত্ব সহকারে বলা হয়েছে।

উল্লেখযোগ্য কিতাবসমূহের নাম-

(১).তাফসীরে ইবনু আবি হাতেম, খন্ড-১২, পৃষ্ঠা-২১৪। (২).তাফসীরে রুহুল মায়ানী, খন্ড-২৫, পৃষ্ঠা-১১০। (৩).তাফসীরে বাহরুল মুহীত, খন্ড-৮, পৃষ্ঠা-২৪। (৪).তাফসীরে ফাতহুল কাদীর, খন্ড-৪, পৃষ্ঠা-৫৭০। (৫).তাফসীরে যাদুল মাছির, খন্ড-৭, পৃষ্ঠা-১২২। (৬).তাফসীরে নাসাফী, খন্ড-৩, পৃষ্ঠা-৩০২। (৭). তাফসীরে নিসাপুরী, খন্ড-৬, পৃষ্ঠা-৪৯০। (৮). তাফসীরে কাশ্শাফ, খন্ড-৪, পৃষ্ঠা-২৭২। (১০). তাফসীরে নুকুত ওয়াল উয়ূন, খন্ড-৬, পৃষ্ঠা-৪৯০। (১১). তাফসীরে দুররে মানসূর, খন্ড-১২, পৃষ্ঠা-৬৯। (১২). তাফসীরে খাজেন, খন্ড-৬, পৃষ্ঠা-১৪৩। (১৩). তাফসীরে আল বোরহান, খন্ড-২৩, পৃষ্ঠা-১১৬। (১৪). তাফসীরে রাযী, খন্ড-১৭, পৃষ্ঠা-১৩৩। (১৫). তাফসীরে আলুসী, খন্ড-১৮, পৃষ্ঠা-৪২৪। (১৬). তাফসীরে হাক্কী, খন্ড-৫, পৃষ্ঠা-৬। (১৭).তাফসীরে কুরতুবী, খন্ড-১৬, পৃষ্ঠা-১২৭। (১৮). তাফসীরে সাভী, খন্ড-২, পৃষ্ঠা-৩০২। (১৯). তাফসীরে ইবনে কাসীর, খন্ড-৭, পৃষ্ঠা-২৪৬। (২০). তাফসীরে জামিউল বায়ান, খন্ড-২০, পৃষ্ঠা-১৫১। (২১). তাফসীরে নুসূকী, খন্ড-৪, পৃষ্ঠা-১২০। (২২). তাফসীরে কাদের, খন্ড-৪, পৃষ্ঠা-১৬৬। (২৩). তাফসীরে মাযহারী, খন্ড-৮, পৃষ্ঠা-৩৬৮। (২৪). তাফসীরে কাসেমী, খন্ড-৮, পৃষ্ঠা-৩৬৮। (২৫). তাফসীরে কোশাইরী, খন্ড-৩, পৃষ্ঠা-১৯০, (২৬). তাফসীরে আবু সাউদ, খন্ড-৬, পৃষ্ঠা-১৩০। (২৭). তাফসীরে আয়াতুল আহকাম, খন্ড-৪, পৃষ্ঠা-১৬৬। (২৮). তাফসীরে রুহুল বয়ান, খন্ড-৩, পৃষ্ঠা-৫৯৮। (২৯). তাফসীরে কাশেফুল আসরার, খন্ড-৯, পৃষ্ঠা-৯৪-৯৮ পৃষ্ঠা। (৩০). তাফসীরে মাওয়ারদী, খন্ড-৪, পৃষ্ঠা-১০২। (৩১). তাফসীরে সিরাজুম মুনির, খন্ড-৩, পৃষ্ঠা-৪৫৮। (৩২). কানজুল ঈমান শরীফ।

শবে বরাত সম্পর্কে হাদিস 

দলীল নং : ১

হযরত আবূ মূসা আশয়ারী (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) রাসূলে কারীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হতে বর্ণনা করেন। রাসূলে পাক (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এরশাদ ফরমান- মধ্য শাবানের রাত্রিতে আল্লাহ পাক রহমতের তাজাল্লী ফরমান এবং তার সমস্ত বান্দাকে ক্ষমা করে দেন। কিন্তু মুশরিক বা শত্রুতাপোষণকারী ব্যক্তিকে ক্ষমা করেন না।
{তথ্য সূত্র: (১).ইবনে মাজাহ শরীফ, পৃষ্ঠা-১০০, হাদীস নং-১৩৮৯, মিশকাত শরীফ, পৃষ্ঠা-১১৫। (২). ইমাম বায়হাকী,শুয়াবুল ঈমান, খন্ড-৩, পৃষ্ঠা- ৩৮২। (৩).ফাজায়েলুল আওকাত, পৃষ্ঠা-১৩৩, হাদীস নং-২৯। (৪).মিসবাহুজ জুজাযাহ, খন্ড-১, পৃষ্ঠা-৪৪২, হাদীস নং-৪৮৭। (৫).আত তারগীব ওয়াত তারহীব, খন্ড-৩য়, হাদীস নং-২৭১৮। (৬).আহলে হাদীস তথা লা-মাযহাবীদের নির্ভরযোগ্য ব্যক্তি নাসির উদ্দীন আলবানীর “সিলসিলাতুল আহাদিছে ছহিহা” এর খন্ড-৩, পৃষ্ঠা-১৩১ আরো ৫ টি হাদীস রয়েছে।}

See More  কওমি মাদ্রাসার ক্লাসের নাম সমূহ বিস্তারিত তথ্য 2026

দলীল: ২

হযরত মুয়াজ বিন জাবাল (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী করিম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, মধ্য শাবানের রাত্রিতে মহান আল্লাহ দুনিয়ার আসমানে জালওয়া রাখেন, অত:পর তাঁর সকল বান্দাকে ক্ষমা করে দেন। কিন্তু মুশরিক বা শত্রæতাপোষণকারী ব্যক্তিকে ক্ষমা করেন না।

{তথ্য সূত্র: (১). ইমাম বায়হাকী, শুয়াবুল ঈমান, হাদীস নং-৩৮৩৩। (২).সহীহ ইবন হিব্বান, খন্ড-১৩, পৃষ্ঠা-৩৫৫, হাদীস নং ১৯৮০। (৩).আহলে হাদীস তথা লা-মাযহাবীদের নির্ভরযোগ্য ব্যক্তি নাসির উদ্দিন আলবানীর “সিলসিলাতুল আহাদিস আসসাহীহা”এর খন্ড-৩, পৃষ্ঠা-১৩৫, হাদীস নং-১১৪৪। (৪).মুজামুল কাবীর, খন্ড-১৫, পৃষ্ঠা-২২১। (৫).ফাজায়েলুল আওকাত, পৃষ্ঠা-১১৯, হাদীস নং-২২। (৬).আত তারগীব ওয়াত তারহীব, খন্ড-২, পৃষ্ঠা-২৪১। (৭).মাজমাউয যাওয়ায়েদ, খন্ড-৮, পৃষ্ঠা-৬৫। (৮).আল হিলয়াহ, খন্ড-৫, পৃষ্ঠা-১৯১। (৯).আসসুন্নাহ, হাদীস নং-৫১২।}

দলীল নং : ৩

উম্মুল মোমেনীন মাহবুবায়ে মাহবুবে রাব্বিল আলামিন হযরত আয়েশা সিদ্দিকা (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন- সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম  হযরত আয়েশা (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) কে জিজ্ঞেস করলেন- হে আয়েশা! শাবান মাসের মধ্য রাতের মর্যাদা ও বুযুর্গী সম্পর্কে তুমি কি জান? তিনি আরজ করলেন ইয়া রাসূলাল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) শাবান মাসের মধ্যবর্তী রাতের কি মর্যাদা রয়েছে? আল্লাহ হাবিব (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) উত্তরে বললেন- আগামী এক বছরে কতজন আদম সন্তান ভূমিষ্ট হবে এবং কতজন আদম সন্তান মৃত্যুবরণ করবে তা এ রাত্রে লিপিবদ্ধ করা হয়। আর এ রাত্রিতে তাদের আমল মহান আল্লাহ দরবারে উপস্থাপন করা হয় এবং তাদের রিযিক অবতীর্ণ কিংবা নির্ধারণ করা হয়।

অত:পর হযরত আয়েশা (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু)বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) “আল্লাহ রহমত ছাড়া কারো পক্ষে কি জান্নাতে যাওয়া সম্ভব নয়? রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, মহান আল্লাহ বিশেষ রহমত ও একান্ত অনুগ্রহ ছাড়া কারো পক্ষে জান্নাতে যাওয়া সম্ভব নয়। এ কথাটি রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তিনবার বললেন। {তথ্য সূত্র: (১).মিশকাত শরীফ, পৃষ্ঠা-১১৫। (২).ফাজায়েলুল আওকাত, হাদীস নং ২৬।}

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *