মাথা যন্ত্রণা কমানোর ঘরোয়া উপায় বলতে সহজ কিছু অভ্যাস ও প্রাকৃতিক পদ্ধতি বোঝায়, যা হালকা ব্যথা দ্রুত কমাতে সাহায্য করে। পর্যাপ্ত পানি পান না করলে অনেক সময় মাথা ব্যথা হয়, তাই প্রথমে শরীর হাইড্রেট রাখা জরুরি।
শান্ত জায়গায় কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিলে ও চোখ বন্ধ করে থাকলে আরাম পাওয়া যায়। কপালে ঠান্ডা পানির কাপড় বা বরফ সেঁক দিলে ব্যথা কমে। আদা বা লেবু চা খেলে উপকার মেলে। হালকা ম্যাসাজ ও গভীর শ্বাস-প্রশ্বাসও চাপ কমায়। তবে ব্যথা বেশি বা দীর্ঘস্থায়ী হলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
মাথা যন্ত্রণা কমানোর ঘরোয়া উপায়
মাথা যন্ত্রণার সমস্যায় আমরা প্রায়ই ভুগি। সব সময় ওষুধ না খেয়ে ঘরোয়া কিছু অভ্যাসের মাধ্যমে এই যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। নিচে ১০টি কার্যকর ঘরোয়া উপায় সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো:
১. প্রচুর পানি পান করা
শরীরে পানির অভাব বা ডিহাইড্রেশন মাথা ব্যথার অন্যতম প্রধান কারণ। যখন শরীরে পর্যাপ্ত তরল থাকে না, তখন মস্তিষ্ক সাময়িকভাবে সংকুচিত হয়ে রক্তনালী থেকে দূরে সরে যায়, যা ব্যথার সৃষ্টি করে। এই সমস্যা এড়াতে সারাদিন অল্প অল্প করে পানি পান করুন। শুধু পানি ভালো না লাগলে ডাবের পানি বা লেবুর শরবত খেতে পারেন। নিয়মিত পর্যাপ্ত পানি পান করলে শরীরের বিষাক্ত পদার্থ বেরিয়ে যায় এবং রক্ত সঞ্চালন স্বাভাবিক থাকে।
২. আদা চা বা আদা চিবানো
আদা প্রাকৃতিক ব্যথানাশক হিসেবে কাজ করে। এতে থাকা ‘জিনজারোল’ উপাদান মস্তিষ্কের রক্তনালীর প্রদাহ কমাতে সাহায্য করে। মাথা ব্যথা শুরু হলে এক টুকরো কাঁচা আদা চিবিয়ে খেতে পারেন অথবা আদা দিয়ে গরম চা বানিয়ে পান করতে পারেন। এটি বিশেষ করে মাইগ্রেনের ব্যথা এবং মাথা ব্যথার সাথে থাকা বমি বমি ভাব দূর করতে দারুণ কার্যকর। আদা চা পানে শরীর শিথিল হয় এবং স্নায়ু শান্ত থাকে।
৩. লবঙ্গ ও লবণের ব্যবহার
লবঙ্গ মাথা ব্যথা কমাতে বেশ প্রাচীন একটি টোটকা। লবঙ্গ ভেজে নিয়ে একটি পরিষ্কার কাপড়ে পুটলি করে বেঁধে তার ঘ্রাণ নিতে পারেন। এছাড়া লবঙ্গের গুঁড়োর সাথে সামান্য লবণ মিশিয়ে দুধের সাথে খেলে খুব দ্রুত উপকার পাওয়া যায়। লবঙ্গের শীতল করার ক্ষমতা এবং লবণের খনিজ উপাদানগুলো রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করে মাথার ওপর চাপ কমায়। এটি তাৎক্ষণিক আরাম দিতে সক্ষম।
৪. পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও ঘুম
অপর্যাপ্ত ঘুম বা অতিরিক্ত মানসিক চাপের কারণে মাথা ব্যথা হওয়া খুব সাধারণ বিষয়। যদি মাথা ব্যথা শুরু হয়, তবে অন্ধকার এবং শান্ত একটি ঘরে ১৫ থেকে ৩০ মিনিট চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাকুন। ঘুমের অভাব আপনার স্নায়ুগুলোকে উত্তেজিত করে তোলে। প্রতিদিন অন্তত ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা গভীর ঘুম নিশ্চিত করলে দীর্ঘমেয়াদী মাথা ব্যথার সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। বিশ্রাম নিলে মস্তিষ্কের কোষগুলো পুনর্গঠিত হওয়ার সুযোগ পায়।
৫. গোলমরিচ ও পুদিনা পাতার চা
গোলমরিচ রক্ত সঞ্চালন বাড়াতে এবং সাইনাসের সমস্যা দূর করতে সাহায্য করে। অন্যদিকে পুদিনা পাতার মেন্থল উপাদান পেশি শিথিল করে। এক কাপ গরম পানিতে কয়েকটি গোলমরিচ এবং কয়েক টুকরো পুদিনা পাতা ফুটিয়ে চা তৈরি করে নিন। এই চা পান করলে মাথার ভেতরের ভারি ভাব দ্রুত কেটে যায়। বিশেষ করে সর্দি বা ঠান্ডাজনিত মাথা ব্যথায় এই পানীয়টি ওষুধের মতো কাজ করে।
৬. অ্যাপেল সাইডার ভিনেগার
শরীরের অ্যাসিড ও ক্ষারের ভারসাম্য নষ্ট হলে অনেক সময় মাথা ব্যথা হয়। এক গ্লাস গরম পানিতে এক চামচ অ্যাপেল সাইডার ভিনেগার এবং এক চামচ মধু মিশিয়ে পান করুন। এটি শরীরের পিএইচ (pH) মাত্রা ঠিক রাখতে সাহায্য করে। এছাড়া এটি হজম প্রক্রিয়া উন্নত করে, যার ফলে গ্যাস্ট্রিকের কারণে হওয়া মাথা ব্যথা দ্রুত কমে যায়। আপনি চাইলে গরম পানিতে ভিনেগার মিশিয়ে তার ভাপও নিতে পারেন।
৭. গরম বা ঠান্ডা সেঁক
ব্যথার ধরণ অনুযায়ী সেঁক নিলে দ্রুত আরাম পাওয়া যায়। যদি মাইগ্রেনের ব্যথা হয়, তবে কপালে বরফ বা ঠান্ডা কাপড়ের সেঁক দিন। এটি রক্তনালীকে সংকুচিত করে ব্যথা কমায়। আবার যদি দুশ্চিন্তা বা চাপের কারণে ব্যথা হয়, তবে ঘাড়ের পেছনের অংশে গরম পানির ব্যাগ বা গরম কাপড়ের সেঁক দিন। এটি শক্ত হয়ে যাওয়া পেশিগুলোকে নরম করে এবং রক্ত চলাচল স্বাভাবিক করে তোলে।
৮. দারুচিনির পেস্ট
দারুচিনি শুধু মশলা নয়, এটি মাথা ব্যথার মহৌষধ। কিছু দারুচিনি গুঁড়ো করে তাতে সামান্য পানি মিশিয়ে ঘন পেস্ট তৈরি করুন। এই পেস্ট কপালে এবং রগ সংলগ্ন স্থানে লাগিয়ে ৩০ মিনিট শুয়ে থাকুন। এরপর হালকা গরম পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলুন। দারুচিনির ঔষধি গুণাগুণ কপালে রক্ত সঞ্চালন বাড়িয়ে দেয় এবং ব্যথার তীব্রতা কমিয়ে দেয়। এটি ঠান্ডা জনিত মাথা ব্যথায় সবচেয়ে ভালো কাজ করে।
৯. ম্যাগনেসিয়াম সমৃদ্ধ খাবার
শরীরে ম্যাগনেসিয়ামের অভাব হলে ঘনঘন মাথা ব্যথা বা মাইগ্রেন হতে পারে। ম্যাগনেসিয়াম স্নায়ুর কার্যকারিতা ঠিক রাখে এবং রক্তনালীকে শিথিল করে। নিয়মিত খাদ্যতালিকায় কাজু বাদাম, কুমড়োর বীজ, ডার্ক চকোলেট, কলা এবং পালং শাকের মতো ম্যাগনেসিয়াম সমৃদ্ধ খাবার রাখুন। যারা নিয়মিত এই খনিজ উপাদান গ্রহণ করেন, তাদের মাথা ব্যথার প্রকোপ অন্যদের তুলনায় অনেক কম থাকে। এটি দীর্ঘমেয়াদী সুস্বাস্থ্যের জন্য জরুরি।
১০. চোখের বিশ্রাম
বর্তমান সময়ে দীর্ঘক্ষণ কম্পিউটার বা মোবাইলের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকার কারণে ‘আই স্ট্রেন’ বা চোখের ওপর চাপ সৃষ্টি হয়। এটি তীব্র মাথা ব্যথার কারণ। প্রতি ২০ মিনিট কাজ করার পর অন্তত ২০ সেকেন্ডের জন্য দূরে কোথাও তাকিয়ে থাকুন। ডিজিটাল স্ক্রিনের নীল আলো চোখের স্নায়ুতে চাপ দেয়। কাজ করার সময় উজ্জ্বলতা কমিয়ে রাখুন এবং মাঝেমধ্যে চোখে মুখে ঠান্ডা পানির ঝাপটা দিন।

