হস্তমৈথুন থেকে বাঁচার উপায় জেনে হস্তমৈথুনের অভ্যাস থেকে বের হতে চাইলে আগে নিজের মন ও দৈনন্দিন রুটিনের দিকে নজর দেওয়া জরুরি। একা ও অলস সময় বেশি থাকলে এ ধরনের চিন্তা বাড়ে, তাই নিজেকে ব্যস্ত রাখুন। নিয়মিত ব্যায়াম, পড়াশোনা, কাজ বা কোনো শখে সময় দিন। মোবাইল বা ইন্টারনেটে অপ্রয়োজনীয় কনটেন্ট এড়িয়ে চলুন। পর্যাপ্ত ঘুম ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন মানসিক নিয়ন্ত্রণ বাড়ায়। হঠাৎ বন্ধ করতে না পারলে ধীরে ধীরে কমানোর চেষ্টা করুন। প্রয়োজনে বিশ্বস্ত কারো সঙ্গে কথা বলুন বা কাউন্সেলরের সাহায্য নিন। আত্মনিয়ন্ত্রণ ও ইতিবাচক চিন্তাই এই অভ্যাস থেকে দূরে থাকতে সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
হস্তমৈথুন থেকে বাঁচার উপায়
স্তমৈথুন বা অতিরিক্ত বীর্যপাত নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি মূলত মানসিক এবং অভ্যাসগত পরিবর্তনের ওপর নির্ভর করে। এটি কোনো রোগ নয়, তবে আসক্তিতে পরিণত হলে দৈনন্দিন জীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। নিচে এর থেকে মুক্তির ১০টি কার্যকরী উপায় বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. ট্রিগার পয়েন্ট চিহ্নিত করা
নিজেকে পর্যবেক্ষণ করুন এবং বোঝার চেষ্টা করুন কোন সময় বা কোন পরিস্থিতিতে আপনার হস্তমৈথুনের ইচ্ছা বেশি জাগে। অনেক সময় একাকীত্ব, ইন্টারনেটে নির্দিষ্ট কোনো সাইট বা অতিরিক্ত সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার এই ইচ্ছাকে উসকে দেয়। আপনার ট্রিগারগুলো খুঁজে বের করে সেগুলো এড়িয়ে চলাই হলো প্রথম পদক্ষেপ। যেমন, যদি রাতে বিছানায় ফোন ব্যবহারের কারণে এমনটা হয়, তবে ঘুমানোর অন্তত এক ঘণ্টা আগে ফোন দূরে রাখার অভ্যাস করুন। সচেতনতাই আসক্তি ভাঙার মূল চাবিকাঠি।
২. পর্নোগ্রাফি বর্জন করা
হস্তমৈথুনের আসক্তির পেছনে পর্নোগ্রাফি সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করে। এটি মস্তিষ্কের ডোপামিন সিস্টেমকে অস্বাভাবিকভাবে উত্তেজিত করে তোলে। পর্নোগ্রাফি দেখা বন্ধ করতে ফোনের ব্রাউজারে ‘অ্যাডাল্ট ফিল্টার’ ব্যবহার করুন অথবা এ ধরনের সাইট ব্লক করে দেয় এমন অ্যাপ ইনস্টল করুন। যখনই পর্ন দেখার ইচ্ছা জাগবে, দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে অন্য কোনো কাজে মন দিন। ধীরে ধীরে মস্তিষ্ক কৃত্রিম উত্তেজনা ছাড়াই স্বাভাবিক হতে শুরু করবে এবং আপনার আত্মনিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে।
৩. শরীরচর্চা ও ব্যায়াম
অতিরিক্ত শারীরিক শক্তি ও মানসিক উত্তেজনা প্রশমিত করার সেরা মাধ্যম হলো ব্যায়াম। প্রতিদিন অন্তত ৩০ থেকে ৪০ মিনিট ঘাম ঝরানো ব্যায়াম করলে শরীরে এন্ডোরফিন হরমোন নিঃসরণ হয়, যা মনকে ফুরফুরে রাখে। জিম করা, দৌড়ানো বা সাঁতার কাটার ফলে শরীর ক্লান্ত থাকে, যা রাতে দ্রুত ঘুমাতে সাহায্য করে। এতে করে বিছানায় শুয়ে অবান্তর চিন্তা করার বা হস্তমৈথুন করার মতো শক্তি ও ইচ্ছা অবশিষ্ট থাকে না। শরীরচর্চা আপনার আত্মবিশ্বাসও বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
৪. একাকীত্ব এড়িয়ে চলা
বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মানুষ তখনই হস্তমৈথুন করে যখন সে একা থাকে। তাই চেষ্টা করুন দিনের বেশিরভাগ সময় পরিবার বা বন্ধুদের সাথে কাটাতে। নিজের ঘরের দরজা সব সময় বন্ধ না রেখে খোলা রাখুন। যখনই মনে হবে আপনি একা আছেন এবং পুরোনো অভ্যাস ফিরে আসছে, তখনই জনসমাগম আছে এমন স্থানে চলে যান। মানুষের মধ্যে থাকলে আপনার মস্তিষ্ক চাইলেও আপনাকে অনৈতিক বা গোপন কোনো কাজে উদ্বুদ্ধ করতে পারবে না। সামাজিক মেলামেশা মনের অস্থিরতা কমাতে দারুণ কাজ করে।
৫. নতুন কোনো শখ গড়ে তোলা
মস্তিষ্ক যখন অবসর থাকে, তখনই সে পুরোনো অভ্যাসের দিকে ঝুঁকে পড়ে। তাই নিজেকে ব্যস্ত রাখতে নতুন কিছু শিখতে শুরু করুন। এটি হতে পারে কোনো বাদ্যযন্ত্র শেখা, বই পড়া, বাগান করা বা কোনো নতুন ভাষা রপ্ত করা। যখন আপনি নতুন কিছু শেখার পেছনে সময় দেবেন, তখন আপনার মনোযোগ বিভাজিত হয়ে যাবে। সৃজনশীল কাজগুলো ডোপামিনের অভাব পূরণ করে এবং মানসিকভাবে তৃপ্তি দেয়, ফলে হস্তমৈথুনের মতো ক্ষণস্থায়ী সুখানুভূতির প্রয়োজনীয়তা কমে যায়।
৬. খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন
আপনার গ্রহণ করা খাবার আপনার চিন্তাভাবনার ওপর প্রভাব ফেলে। অতিরিক্ত মশলাযুক্ত, চর্বিযুক্ত বা উত্তেজক খাবার এড়িয়ে চলার চেষ্টা করুন। গবেষণায় দেখা গেছে, স্বাস্থ্যকর এবং সুষম খাদ্য গ্রহণ করলে হরমোনের ভারসাম্য বজায় থাকে এবং অতিরিক্ত কামভাব নিয়ন্ত্রণে আসে। প্রচুর পরিমাণে ফলমূল, শাকসবজি এবং পানি পান করুন। রাতে ঘুমানোর আগে খুব বেশি ভারী খাবার খাবেন না, কারণ এতে শারীরিক অস্বস্তি হতে পারে যা ঘুমের ব্যাঘাত ঘটায় এবং আপনার পুরোনো অভ্যাসকে উসকে দিতে পারে।
৭. ঠান্ডা পানিতে গোসল
যৌন উত্তেজনা প্রশমিত করার একটি তাৎক্ষণিক এবং কার্যকরী উপায় হলো ঠান্ডা পানিতে গোসল করা। যখনই আপনি তীব্র তাড়না অনুভব করবেন, তখনই বাথরুমে গিয়ে ঠান্ডা পানিতে গোসল করে নিন। এটি শরীরের তাপমাত্রা কমিয়ে দেয় এবং স্নায়ুতন্ত্রকে শান্ত করে। ঠান্ডা পানি আপনার মনোযোগ কামভাব থেকে সরিয়ে শরীরের বর্তমান অনুভূতির দিকে নিয়ে আসে। এটি কেবল আপনার ইচ্ছাশক্তি বাড়ায় না, বরং আপনার রক্ত সঞ্চালন উন্নত করে এবং মনকে সতেজ করে তোলে।
৮. নিয়মিত নামাজ
মানসিক প্রশান্তি ও আত্মনিয়ন্ত্রণ অর্জনের জন্য নামাজ অত্যন্ত জরুরি। আপনি যদি ইসলামে অনুশাসনে বিশ্বাসী হন, তবে নিয়মিত নামাজ পড়ুন। এটি মনে পবিত্রতা আনে এবং নেতিবাচক চিন্তা থেকে দূরে রাখে। অন্যদিকে, মেডিটেশন বা ধ্যানের মাধ্যমে আপনি আপনার মনের ওপর নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতে পারেন। প্রতিদিন ১০-১৫ মিনিট নিভৃতে বসে নিজের দীর্ঘশ্বাস পর্যবেক্ষণ করলে মানসিক অস্থিরতা কমে যায়। মন শান্ত থাকলে হুটহাট করে কোনো ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়া বা আসক্তিতে পড়া কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।
৯. নির্দিষ্ট রুটিন মেনে চলা
একটি সুশৃঙ্খল জীবনযাপন আসক্তি থেকে মুক্তির পথ প্রশস্ত করে। প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমাতে যাওয়া এবং ভোরে ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস করুন। সারাদিনের কাজের একটি তালিকা বা রুটিন তৈরি করুন এবং সেটি কঠোরভাবে মেনে চলার চেষ্টা করুন। যখন আপনার কাছে পরবর্তী কাজের একটি লক্ষ্য থাকবে, তখন অলস সময় কাটানোর সুযোগ থাকবে না। শৃঙ্খলা আপনার অবচেতন মনকে সংকেত দেয় যে, আপনি আপনার জীবনের নিয়ন্ত্রণে আছেন, যা আপনার আত্মবিশ্বাস ও ইচ্ছাশক্তি বাড়িয়ে দেয়।
১০. ব্যর্থতায় ভেঙে না পড়া
অভ্যাস পরিবর্তন করা একটি দীর্ঘ মেয়াদী প্রক্রিয়া। কোনো কারণে একদিন আপনি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেললে হতাশ হয়ে সব ছেড়ে দেবেন না। মনে রাখবেন, একদিনের ব্যর্থতা মানে এই নয় যে আপনি আবার শূন্যে ফিরে গেছেন। নিজের ওপর রাগ না করে কেন এমন হলো তা বিশ্লেষণ করুন এবং পরের দিন থেকে আবার নতুন উদ্যমে শুরু করুন। নিজেকে ক্ষমা করতে শিখুন এবং সফলতার ছোট ছোট ধাপগুলো উদযাপন করুন। ধৈর্য এবং জেদ থাকলে যেকোনো পুরোনো আসক্তি থেকে স্থায়ীভাবে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।
হস্ত মৈথুনের ক্ষতিকর প্রভাব ইসলাম
ইসলামিক দৃষ্টিভঙ্গিতে মানুষের যৌন আকাঙ্ক্ষাকে কেবল বিবাহের মাধ্যমে বৈধভাবে পূরণ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অধিকাংশ ইসলামি স্কলার ও ফিকহ শাস্ত্রবিদদের মতে, হস্তমৈথুন (ইস্তিমনা) জায়েজ নয়। কোরআন ও হাদিসের আলোকে এর নেতিবাচক বা ক্ষতিকর প্রভাবগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:
১. চারিত্রিক পবিত্রতা নষ্ট হওয়া
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা মুমিনদের গুণাবলি বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছেন, “এবং যারা তাদের যৌনাঙ্গকে হেফাজত করে, তবে তাদের স্ত্রী বা মালিকানাধীন দাসীদের ক্ষেত্র ছাড়া… আর যারা এদের ছাড়া অন্য কিছু কামনা করবে, তারাই সীমালঙ্ঘনকারী।” (সূরা মুমিনুন: ৫-৭)। হস্তমৈথুনকে এখানে ‘সীমালঙ্ঘন’ হিসেবে দেখা হয়, যা একজন মুমিনের চারিত্রিক দৃঢ়তা কমিয়ে দেয়।
২. ইবাদতে অমনোযোগ ও মানসিক অবসাদ
এই অভ্যাসটি মানুষকে একাকীত্ব এবং গোপন পাপে আসক্ত করে তোলে। ফলে ইবাদত বা নামাজে একাগ্রতা হারিয়ে যায়। অনর্থক কাজের প্রতি আসক্তি তৈরি হওয়ার কারণে জিকির বা কোরআন তেলাওয়াতে মন বসানো কঠিন হয়ে পড়ে। এতে এক ধরনের আত্মিক শূন্যতা ও অপরাধবোধ তৈরি হয়, যা মানুষকে আল্লাহর রহমত থেকে দূরে সরিয়ে দেয়।
৩. বৈবাহিক জীবনের প্রতি অনীহা
ইসলামে বিয়েকে অর্ধেক ঈমান বলা হয়েছে। হস্তমৈথুনের অভ্যাস মানুষকে কৃত্রিম উপায়ে তৃপ্তি নিতে শিখিয়ে দেয়, যার ফলে বাস্তব জীবনের দায়িত্ব এবং বিবাহের প্রতি আগ্রহ কমে যেতে পারে। এটি অনেক সময় বিবাহিত জীবনে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার স্বাভাবিক সম্পর্ক ও ঘনিষ্ঠতায় বাধার সৃষ্টি করে, যা পরিবারের শান্তি নষ্ট করে।
৪. মানসিক ও শারীরিক ক্ষতি
ইসলাম শারীরিক ও মানসিকভাবে নিজেকে ক্ষতিগ্রস্ত করাকে নিষিদ্ধ করেছে। হাদিসে এসেছে, “নিজের ক্ষতি করা যাবে না, অন্য কারো ক্ষতিও করা যাবে না।” (ইবনে মাজাহ)। চিকিৎসাবিজ্ঞান ও ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি উভয় মতেই, অতিরিক্ত হস্তমৈথুন স্মৃতিশক্তি হ্রাস করা, শরীর দুর্বল করা এবং স্নায়বিক অস্থিরতা তৈরির কারণ হতে পারে। এটি তওবা করার সংকল্পকে দুর্বল করে দেয়।
৫. আখেরাতের জবাবদিহিতা
ইসলামি বিশ্বাস অনুযায়ী, কিয়ামতের দিন শরীরের প্রতিটি অঙ্গ আল্লাহর কাছে সাক্ষ্য দেবে। হাত দিয়ে করা কোনো অন্যায় কাজ সেদিন মানুষের বিরুদ্ধে দাঁড়াবে। এই জবাবদিহিতার ভয় না থাকলে মানুষ ক্রমে বড় গুনাহের দিকে ধাবিত হয়।

