মেয়েদের হস্ত মৈথুনের ক্ষতিকর প্রভাব রয়েছে আবার কিছু ভুল ধারনাও আছে। মেয়েদের হস্ত মৈথুন নিয়ে অনেক ভুল ধারণা প্রচলিত আছে। বৈজ্ঞানিকভাবে এটি সাধারণত ক্ষতিকর নয় এবং অনেকের ক্ষেত্রে স্বাভাবিক বিষয়। তবে অতিরিক্ত বা নিয়ন্ত্রণহীন হলে কিছু সমস্যা দেখা দিতে পারে।
যেমন অস্থায়ী শারীরিক অস্বস্তি, ত্বকে জ্বালা, মনোযোগের ঘাটতি বা দৈনন্দিন কাজে আগ্রহ কমে যাওয়া। মানসিকভাবে অপরাধবোধ বা লজ্জা থেকেও চাপ তৈরি হতে পারে, বিশেষ করে সামাজিক ভ্রান্ত ধারণার কারণে। স্বাস্থ্যকর সীমা বজায় রাখা, নিজের শরীরের যত্ন নেওয়া আর সঠিক তথ্য জানা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সমস্যা মনে হলে চিকিৎসক বা কাউন্সেলরের সঙ্গে কথা বলা উচিত।
মেয়েদের হস্ত মৈথুনের ক্ষতিকর প্রভাব
মেয়েদের হস্তমৈথুন বা ফিঙ্গারিং নিয়ে আমাদের সমাজে অনেক ভুল ধারণা এবং অহেতুক ভীতি কাজ করে। চিকিৎসাবিজ্ঞান এবং আধুনিক গবেষণার মতে, এটি একটি স্বাভাবিক জৈবিক প্রক্রিয়া এবং এর কোনো দীর্ঘমেয়াদী শারীরিক ক্ষতি নেই। তবে যেকোনো অভ্যাসের মতো এটিও যদি মাত্রারিক্ত হয় বা ভুল পদ্ধতিতে করা হয়, তবে কিছু নেতিবাচক প্রভাব দেখা দিতে পারে।
১. আসক্তি এবং মানসিক নির্ভরশীলতা
মাস্টারবেশন যখন অভ্যাসে পরিণত হয়, তখন এটি আসক্তির রূপ নিতে পারে। বারবার বীর্যপাত বা অর্গাজমের ফলে মস্তিষ্কে ডোপামিন হরমোন নিঃসৃত হয়, যা এক ধরণের সাময়িক তৃপ্তি দেয়। অনেক সময় বিষণ্ণতা বা একাকীত্ব থেকে মুক্তি পেতে মেয়েরা এতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা দৈনন্দিন কাজে মনোযোগ কমিয়ে দেয় এবং সামাজিক জীবন ব্যাহত করতে পারে।
২. প্রকৃত মিলনের প্রতি অনাগ্রহ
যাঁরা দীর্ঘ সময় ধরে মাস্টারবেশনে অভ্যস্ত, তাঁদের মধ্যে অনেকে পরবর্তীকালে বৈবাহিক জীবনে প্রকৃত যৌন মিলনের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলতে পারেন। নিজের শরীরকে নিজে যেভাবে উত্তেজিত করতে পারেন, সঙ্গীর কাছ থেকে সেই একই উদ্দীপনা না পেলে যৌন জীবনে অতৃপ্তি তৈরি হতে পারে। একে চিকিৎসাবিজ্ঞানে অনেক সময় ‘পছন্দসই স্টিমুলেশন’ এর অভাব বলা হয়।
৩. শারীরিক আঘাত বা ক্ষত
অসাবধানতাবশত বা তীব্রভাবে হস্তমৈথুন করলে যোনিপথের নরম টিস্যুতে আঘাত লাগতে পারে। বিশেষ করে নখের আঁচড় বা কোনো কৃত্রিম বস্তু (সেক্স টয়) ব্যবহারের সময় সঠিক পরিচ্ছন্নতা বজায় না রাখলে ত্বকে ক্ষত সৃষ্টি হতে পারে, যা পরে ব্যথার কারণ হয়।
৪. সংক্রমণের ঝুঁকি
মেয়েদের প্রজনন অঙ্গ অত্যন্ত সংবেদনশীল। অপরিষ্কার হাত বা জীবাণুযুক্ত কোনো বস্তু ব্যবহারের মাধ্যমে খুব সহজেই ব্যাকটেরিয়া বা ছত্রাক সংক্রমণ হতে পারে। এর ফলে যোনিপথে চুলকানি, অস্বাভাবিক স্রাব এবং দুর্গন্ধ দেখা দিতে পারে। দীর্ঘমেয়াদী সংক্রমণ জরায়ুর স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
৫. মানসিক অপরাধবোধ
আমাদের সামাজিক ও ধর্মীয় প্রেক্ষাপটে হস্তমৈথুনকে অনেক সময় নেতিবাচকভাবে দেখা হয়। অনেক মেয়ে এটি করার পর প্রচণ্ড মানসিক চাপে ভোগেন বা নিজেকে অপরাধী মনে করেন। এই অপরাধবোধ থেকে দুশ্চিন্তা, অনিদ্রা এবং আত্মবিশ্বাসের অভাব দেখা দিতে পারে, যা মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।
৬. অর্গাজম পেতে সমস্যা
অতিরিক্ত হস্তমৈথুনের ফলে শরীরের সংবেদনশীল স্নায়ুগুলো শিথিল হয়ে যেতে পারে। এর ফলে এক সময় অর্গাজম বা চরম তৃপ্তি পেতে অনেক বেশি সময় লাগে অথবা একেবারেই পাওয়া যায় না। একে চিকিৎস পরিভাষায় ‘অ্যানোরগাসমিয়া’ বলা হয়। এটি পরবর্তীতে যৌন জীবনে হতাশা সৃষ্টি করে।
৭. শারীরিক ক্লান্তি
অতিরিক্ত হস্তমৈথুন করলে শরীর থেকে প্রচুর শক্তি ব্যয় হয়। ঘনঘন এটি করার ফলে শরীরে অবসাদ বা ক্লান্তি দেখা দিতে পারে। এটি নিয়মিত পড়াশোনা, কাজ বা খেলাধুলার মতো দৈনন্দিন কাজে ব্যাঘাত ঘটায়।
হস্তমৈথুন নিজে কোনো রোগ নয়। তবে এটি যেন আপনার জীবনের নিয়ন্ত্রণ না নিয়ে নেয়, সেদিকে খেয়াল রাখা জরুরি। যদি এটি আপনার দৈনন্দিন কাজ বা সম্পর্কে ব্যাঘাত ঘটায়, তবে সৃজনশীল কাজে ব্যস্ত থাকা, ব্যায়াম করা এবং প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ হবে।
মেয়েদের মাস্টারবেশন এর উপকারিতা
মেয়েদের মাস্টারবেশন নিয়ে সমাজে অনেক ভুল ধারণা থাকলেও, চিকিৎসাবিজ্ঞান ও যৌন স্বাস্থ্যের গবেষণায় এর বেশ কিছু ইতিবাচক দিকের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। শরীর ও মনের ওপর এর প্রভাবগুলো বেশ চমকপ্রদ।

নিচে মেয়েদের মাস্টারবেশনের পাঁচটি প্রধান উপকারিতা বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. মানসিক চাপ এবং দুশ্চিন্তা কমানো
মাস্টারবেশনের সময় শরীর থেকে ‘এন্ডোরফিন’ এবং ‘অক্সিটোসিন’ নামক হরমোন নিঃসৃত হয়, যেগুলোকে আমরা সাধারণত ‘হ্যাপি হরমোন’ বলি। এই হরমোনগুলো শরীরের কর্টিসল বা স্ট্রেস হরমোনের মাত্রা কমিয়ে দেয়। ফলে মন শান্ত হয় এবং মানসিক অস্থিরতা বা দুশ্চিন্তা থেকে দ্রুত মুক্তি পাওয়া যায়। এটি অনেকটা প্রাকৃতিক রিলাক্সেশন থেরাপির মতো কাজ করে।
২. পিরিয়ডের ব্যথা ও ক্র্যাম্প উপশম
অনেক মেয়ের পিরিয়ডের সময় পেটে ও কোমরে প্রচণ্ড ব্যথা হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, অর্গাজমের সময় জরায়ুর পেশিগুলো একবার সংকুচিত হয়ে আবার শিথিল হয়। এই প্রক্রিয়ায় জরায়ুর রক্ত সঞ্চালন বৃদ্ধি পায় এবং ব্যথা উপশমকারী কেমিক্যাল নিঃসৃত হয়, যা পিরিয়ডের অস্বস্তি ও ব্যথা কমাতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে।
৩. ভালো ঘুম হতে সাহায্য করে
যাঁদের অনিদ্রা বা ঘুমের সমস্যা আছে, তাঁদের জন্য এটি একটি প্রাকৃতিক সমাধান হতে পারে। অর্গাজমের পর শরীরে ‘প্রোল্যাক্টিন’ হরমোন নিঃসৃত হয়, যা শরীরকে গভীরভাবে শিথিল করে দেয়। এর ফলে প্রাকৃতিকভাবেই ঘুম ঘুম ভাব আসে এবং ঘুমের মান উন্নত হয়। ঘুমানোর আগে মনকে দুশ্চিন্তামুক্ত রাখতে এটি সাহায্য করে।
৪. নিজের শরীর সম্পর্কে ধারণা ও আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি
মাস্টারবেশনের মাধ্যমে একজন নারী বুঝতে পারেন তাঁর শরীরের কোন অংশগুলো বেশি সংবেদনশীল এবং কীভাবে স্পর্শ করলে তিনি আনন্দ পান। নিজের পছন্দ-অপছন্দ সম্পর্কে এই জ্ঞান পরবর্তীতে বৈবাহিক জীবনে বা সঙ্গীর সাথে যৌন সম্পর্কের ক্ষেত্রে আত্মবিশ্বাস বাড়ায়। এটি যৌন সচেতনতা তৈরি করে, যা সুস্থ যৌন জীবনের জন্য অত্যন্ত জরুরি।
৫. রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ও পেলভিক ফ্লোর শক্তিশালী করা
কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত যৌন উত্তেজনা বা অর্গাজম শরীরের ইমিউন সিস্টেমকে সক্রিয় রাখতে সাহায্য করে। এ ছাড়া, যৌন উত্তেজনার সময় পেলভিক ফ্লোরের পেশিগুলো সংকুচিত হয়, যা এই পেশিগুলোকে মজবুত করতে সাহায্য করে। এটি দীর্ঘমেয়াদে মূত্রথলির নিয়ন্ত্রণ ভালো রাখতে এবং শারীরিক সক্ষমতা বজায় রাখতে সহায়ক।
একটি পরামর্শ: যেকোনো কিছুর মতোই এটিও ভারসাম্যপূর্ণ হওয়া উচিত। এটি শরীরের একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হলেও এর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা যেন আপনার সামাজিক বা দৈনন্দিন জীবনকে বাধাগ্রস্ত না করে, সেদিকে খেয়াল রাখা জরুরি।

