সিরাজউদ্দৌলা নাটকের চরিত্রগুলো ইতিহাস ও নাট্যরসকে একসঙ্গে জীবন্ত করে তোলে। প্রধান চরিত্র সিরাজউদ্দৌলা সাহসী, আবেগপ্রবণ ও দেশপ্রেমিক শাসক হিসেবে উপস্থাপিত, যিনি ইংরেজদের ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে লড়াই করেন।
মীরজাফর বিশ্বাসঘাতকতার প্রতীক, তার লোভ ও ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষা পতনের কারণ হয়। ঘনিষ্ঠ সহযোগীরা বিশ্বস্ততা ও দায়িত্ববোধ দেখায়, আর ইংরেজ চরিত্রগুলো কূটনীতি ও ধূর্ততার পরিচয় দেয়। প্রতিটি চরিত্র কাহিনিকে এগিয়ে নিয়ে যায় এবং নৈতিক শিক্ষা দেয়। এসব চরিত্রের মাধ্যমে সাহস, বিশ্বাসঘাতকতা ও দেশপ্রেমের বাস্তব চিত্র ফুটে ওঠে।
সিরাজউদ্দৌলা নাটকের চরিত্র
| দলের নাম | মূল চরিত্রসমূহ | লক্ষ্য |
| স্বাধীনতাকামী | সিরাজ, মোহনলাল, মিরমর্দান, লুৎফুন্নিসা | বাংলার স্বাধীনতা রক্ষা করা। |
| অন্তর্ঘাতী | মিরজাফর, ঘসেটি বেগম, রাজবল্লভ, জগৎশেঠ | সিরাজকে সরিয়ে ক্ষমতা দখল। |
| আগ্রাসী | রবার্ট ক্লাইভ, ওয়াটস, হলওয়েল | ক্ষমতা দখল ও সম্পদ লুণ্ঠন। |
সিরাজউদ্দৌলা নাটকের চরিত্র বিশ্লেষণ
১. দেশপ্রেমিক ও অনুগত চরিত্রসমূহ
এরা নাটকের সেই অংশ যারা দেশ ও নবাবের জন্য নিজেদের উৎসর্গ করেছেন।
নবাব সিরাজউদ্দৌলা: তিনি নাটকের কেন্দ্রীয় ও ট্র্যাজিক চরিত্র। নাটকে তাঁকে একজন সংবেদনশীল মানুষ হিসেবে দেখানো হয়েছে। একদিকে তিনি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ যোদ্ধা, অন্যদিকে আত্মীয়দের ষড়যন্ত্রে তিনি আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। তাঁর বারবার ক্ষমা করার প্রবণতা চরিত্রটিকে মানবিক করলেও রাজনৈতিকভাবে দুর্বল করে তুলেছিল।
মোহনলাল: নবাবের সবচেয়ে বিশ্বস্ত সেনাপতি। তিনি ছিলেন সাহসী এবং সাম্প্রদায়িকতা মুক্ত। মিরজাফর যখন কোরআন ছুঁয়ে মিথ্যা শপথ করছিলেন, মোহনলাল তখনই তাকে চিনে ফেলেছিলেন এবং নবাবকে সতর্ক করেছিলেন। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি নবাবের সঙ্গ ছাড়েননি।
মিরমর্দান: পলাশির প্রান্তরে অসীম সাহসের সাথে যুদ্ধ করা এক বীর সেনানী। যুদ্ধে তাঁর মৃত্যু নবাবের বাহিনীর মনোবল ভেঙে দিয়েছিল। তিনি সত্যনিষ্ঠার প্রতীক।
সাফ্রে: তিনি ছিলেন একজন ফরাসি সেনাপতি। ইংরেজদের প্রতি ঘৃণার কারণে এবং নবাবের প্রতি আনুগত্যের জায়গা থেকে তিনি পলাশির যুদ্ধে লড়াই করেছিলেন।
লুৎফুন্নিসা: নবাবের স্ত্রী। তিনি ধৈর্য ও নিষ্ঠার প্রতীক। স্বামীর কঠিনতম সময়ে তিনি পাশে ছিলেন এবং শেষ পর্যন্ত নবাবের প্রতি তাঁর ভালোবাসা অটুট ছিল।
২. ষড়যন্ত্রকারী ও বিশ্বাসঘাতক চরিত্রসমূহ
এরা নবাবের অমাত্য বা আত্মীয় হয়েও বিদেশি শক্তির সঙ্গে হাত মিলিয়েছিলেন।
মিরজাফর: বিশ্বাসঘাতকতার সমার্থক নাম। তিনি অত্যন্ত ধূর্ত এবং ভণ্ড। নিজের ক্ষমতার লোভে তিনি দেশের স্বাধীনতা বিসর্জন দেন।
ঘসেটি বেগম: নবাবের বড় খালা। তাঁর চরিত্রে কেবল প্রতিহিংসা আর আক্রোশ দেখা যায়। তিনি সিরাজকে ব্যক্তিগত শত্রু মনে করতেন এবং নবাবের ধ্বংস দেখে আনন্দ পেতেন।
রাজবল্লভ, জগৎশেঠ ও রায়দুর্লভ: এঁরা ছিলেন তৎকালীন প্রভাবশালী ব্যবসায়ী ও মন্ত্রী। ব্যক্তিগত লাভ এবং ব্যবসায়িক স্বার্থের জন্য তাঁরা নবাবকে উৎখাত করতে চেয়েছিলেন। এঁদের কাছে দেশের চেয়ে টাকা এবং প্রতিপত্তি বড় ছিল।
উমিচাঁদ: লাহোর থেকে আসা এক অর্থলোভী ব্যবসায়ী। ক্লাইভ তাকে ঠকানোর পর তিনি পাগল হয়ে যান। উমিচাঁদ চরিত্রটি দেখায় যে বিশ্বাসঘাতকদের পরিণতি কখনও ভালো হয় না।
মিরন: মিরজাফরের ছেলে। সে উদ্ধত এবং নিষ্ঠুর। নবাবের নির্মম হত্যাকাণ্ডের পেছনে তার বড় ভূমিকা ছিল।
৩. বিদেশি শক্তি (ইংরেজ কোম্পানি)
রবার্ট ক্লাইভ: ধূর্ত ও কূটনীতিবিদ। তিনি বাঙালির চারিত্রিক দুর্বলতা এবং অভ্যন্তরীণ বিবাদকে কাজে লাগিয়ে বাংলা দখলের নীল নকশা তৈরি করেন।
হলওয়েল: কোম্পানির একজন কর্মচারী ও ডাক্তার। সে অত্যন্ত মিথ্যাবাদী ও ধূর্ত। ‘অন্ধকূপ হত্যা’র মতো মিথ্যা কাহিনী প্রচারের পেছনে তার বড় ভূমিকা ছিল।
ক্যাপ্টেন ক্লেটন: নাটকের শুরুতে ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গের যুদ্ধে তাকে পরাজিত ও ভীত অবস্থায় দেখা যায়।
৪. বিশেষ চরিত্র
নারান সিং (রাইসুল জুহালা): এটি নাটকের অন্যতম চমৎকার একটি চরিত্র। সে নবাবের প্রধান গুপ্তচর। ছদ্মবেশ ধারণে পারদর্শী এই মানুষটি নিজের জীবন বাজি রেখে তথ্য সংগ্রহ করতেন। তাঁর দেশপ্রেম অত্যন্ত উচ্চমানের এবং তিনি বীরের মতো মৃত্যুবরণ করেন।

