সোনার তরী কবিতার মূলভাব – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

সোনার তরী কবিতার মূলভাব মূলত মানুষের জীবনের আশা, পরিশ্রম, স্বপ্ন ও অপূর্ণতার অনুভূতিকে প্রকাশ করে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এখানে সোনার তরীকে স্বপ্ন ও সাফল্যের প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করেছেন।

কবি সারাজীবন পরিশ্রম করে ফসল ফলালেও শেষ পর্যন্ত সেই সোনার তরীতে নিজের স্থান পান না। এর মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে, মানুষ অনেক কিছু অর্জন করলেও সব সময় নিজের প্রাপ্য পায় না। জীবনে ত্যাগ, বেদনা ও না পাওয়ার কষ্ট থেকেই যায়। তাই কবিতাটি আমাদের শেখায়, জীবনের সার্থকতা শুধু অর্জনে নয়, বরং কর্ম ও দায়িত্ব পালনের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে।

সোনার তরী কবিতার মূলভাব

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘সোনার তরী’ কবিতাটি বাংলা সাহিত্যের এক গভীর জীবনদর্শন ও রূপকধর্মী সৃষ্টি। এর মূলভাব বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এটি মূলত মানুষের নশ্বর জীবন এবং তার মহৎ কর্মের মধ্যকার যে চিরন্তন দ্বন্দ্ব, তাকেই ফুটিয়ে তুলেছে।

কবিতার রূপক অনুযায়ী, বর্ষার ভরা নদীর মাঝে একটি ছোট ক্ষেতে কৃষক একাকী বসে আছে। তার চারদিকে পানি বাড়ছে, যা আসলে মৃত্যুর বা মহাকালের এগিয়ে আসাকে নির্দেশ করে। কৃষক তার সারা জীবনের পরিশ্রম দিয়ে যে সোনার ধান ফলিয়েছে, তা সে একটি নৌকায় তুলে দেয়। কিন্তু ট্র্যাজেডি হলো, সেই নৌকায় ধান রাখার জায়গা হলেও খোদ কৃষকের কোনো জায়গা হয় না। এই ‘সোনার ধান’ হলো মানুষের সারা জীবনের অর্জন, শিল্প বা মহৎ কাজ। আর ‘সোনার তরী’ হলো মহাকাল বা ইতিহাস।

গভীরভাবে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, মহাকাল বড়ই নিষ্ঠুর ও নৈর্ব্যক্তিক। এটি মানুষের সৃষ্টিকে সাদরে গ্রহণ করে এবং তাকে ভবিষ্যতের জন্য বয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু যে মানুষটি সেই সৃষ্টিটি তৈরি করল, সেই ব্যক্তি মানুষের জন্য মহাকালের কাছে কোনো স্থান নেই। মানুষ তার কর্মের মাধ্যমে অমর হতে চায়, কিন্তু প্রকৃতি ও সময়ের নিয়মে ব্যক্তি মানুষকে একদিন নিঃস্ব হয়ে বিদায় নিতেই হয়।

See More  এক নজরে রোজা ভঙ্গের কারণ ১৯টি ২০২৬

কবিতার শেষে দেখা যায়, শূন্য নদীর তীরে কৃষক একা পড়ে থাকে যা মানুষের চরম একাকীত্ব ও মৃত্যুর অনিবার্যতার প্রতীক। আমরা পৃথিবীতে যা কিছু সুন্দর সৃষ্টি করি, তা পৃথিবীর ভাণ্ডারে জমা হয়ে যায়, কিন্তু স্রষ্টা নিজে সেখানে ঠাঁই পায় না। অর্থাৎ, মানুষ বাঁচে তার কর্মের মধ্যে, তার দেহের মধ্যে নয়। জীবনের এই ক্ষণস্থায়ীত্ব এবং কর্মের যে চিরস্থায়ী আবেদন, এটাই সোনার তরী কবিতার মূল নির্যাস।

সোনার তরী কবিতার মূলভাব নিজের ভাষায় লেখো

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সোনার তরী বাংলা সাহিত্যের একটি গভীর ভাবসম্পন্ন ও প্রতীকধর্মী কবিতা। এই কবিতায় কবি মানুষের জীবন, পরিশ্রম, স্বপ্ন, ত্যাগ এবং না পাওয়ার বেদনার কথা রূপকের মাধ্যমে তুলে ধরেছেন। প্রথম দৃষ্টিতে এটি একজন কৃষকের গল্প মনে হলেও, আসলে এর ভেতরে লুকিয়ে আছে মানুষের জীবনের দর্শন।

কবিতায় দেখা যায়, কবি বা কৃষক সারাদিন কঠোর পরিশ্রম করে মাঠে সোনালি ধান ফলান। এই ধান তার শ্রম, আশা ও সাফল্যের প্রতীক। এরপর একটি সোনার তরী এসে সেই ফসল নিয়ে যায়। এখানে “সোনার তরী” বিশেষ একটি প্রতীক, যা সাফল্য, স্বপ্নপূরণ বা জীবনের চূড়ান্ত গন্তব্যকে বোঝায়। কৃষক তার সব অর্জন তরীতে তুলে দিলেও, নিজের জন্য সেখানে কোনো জায়গা পায় না। তরী তাকে ফেলে চলে যায়, আর সে একা তীরে দাঁড়িয়ে থাকে।

এই ঘটনাটি মানুষের বাস্তব জীবনের সঙ্গে মিল খুঁজে দেয়। আমরা সারাজীবন পরিশ্রম করি, পরিবার, সমাজ বা অন্যের জন্য অনেক কিছু করি। কিন্তু অনেক সময় নিজের চাওয়া বা প্রাপ্য পূরণ হয় না। জীবনে না পাওয়ার বেদনা থেকেই যায়। কবি এই না পাওয়ার কষ্টকেই খুব সূক্ষ্মভাবে প্রকাশ করেছেন। তবুও তিনি হতাশার কথা বলেননি, বরং জীবনের সত্যকে মেনে নেওয়ার কথা বলেছেন।

কবিতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ত্যাগের ধারণা। মানুষ তার শ্রমের ফল অন্যের কল্যাণে বিলিয়ে দেয়। এই ত্যাগের মধ্যেই জীবনের প্রকৃত মহত্ত্ব লুকিয়ে আছে। সোনার তরীতে নিজের জায়গা না পাওয়ার মধ্যেও এক ধরনের আত্মসমর্পণ ও শান্তি আছে। যেন কবি বলতে চান, সবকিছু নিজের জন্য নয়, কিছু কাজ শুধু দায়িত্ববোধ থেকে করা হয়।

See More  একনজরে কম্পিউটার টাইপিং শেখার নিয়ম ২০২৬

এছাড়া কবিতায় প্রকৃতির বর্ণনাও গভীর অর্থ বহন করে। নদী, মাঠ, ধানক্ষেত সব মিলিয়ে এক নিঃসঙ্গ ও শান্ত পরিবেশ তৈরি হয়েছে, যা কবির মনের অবস্থাকে প্রকাশ করে। এই নিঃসঙ্গতা মানুষের অন্তরের শূন্যতা ও একাকীত্বের প্রতীক।

সব মিলিয়ে, সোনার তরী শুধু একটি গল্প নয়, বরং মানুষের জীবনের দর্শন। এটি আমাদের শেখায়, জীবনে সবকিছু পাওয়া যায় না, তবুও কর্ম করে যেতে হয়। পরিশ্রম, ত্যাগ ও দায়িত্ববোধই জীবনের আসল সার্থকতা। না পাওয়ার মাঝেও জীবনের অর্থ খুঁজে নেওয়াই এই কবিতার মূল শিক্ষা।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *