কওমি মাদ্রাসার ক্লাসের নাম সমূহ বিস্তারিত তথ্য 2026

কওমি মাদ্রাসার ক্লাসের নাম সমূহ ইসলামী ঐতিহ্য ও শিক্ষা ব্যবস্থার সাথে গভীরভাবে যুক্ত। সাধারণত শিক্ষা শুরু হয় নাজেরা বা মক্তব থেকে, যেখানে কুরআন পাঠের ভিত্তি গড়ে ওঠে।

এরপর রয়েছে ইবতিদাইয়্যাহ স্তর, যার মধ্যে নাহবেমীর, মিযান, নাহবেমীর সানী ইত্যাদি ধাপ থাকে। উচ্চ স্তরে দাওরায়ে হাদিস সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, যেখানে হাদিস শাস্ত্রের পূর্ণ পাঠ সম্পন্ন করা হয়। এর আগে কুদূরী, কাফিয়া, শরহে জামী, মিশকাত, জালালাইন প্রভৃতি কিতাব পড়ানো হয়। এসব স্তর ও কিতাবের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা ধীরে ধীরে ফিকহ, হাদিস, তাফসির ও আরবি ব্যাকরণে দক্ষতা অর্জন করে।

কওমি মাদ্রাসার ক্লাসের নাম সমূহ

কওমি মাদ্রাসার শিক্ষাব্যবস্থা অনেকটা সিঁড়ির মতো। প্রতিটি ধাপ বা ক্লাস এমনভাবে সাজানো হয়েছে যাতে একজন শিক্ষার্থী ধীরে ধীরে আরবি ভাষা, সাহিত্য এবং সবশেষে ইসলামি আইন ও দর্শনের গভীরে প্রবেশ করতে পারে।

১. প্রাথমিক স্তর: মারহালাতুল ইবতিদাইয়্যাহ (প্রাইমারি)

এটি কওমি মাদ্রাসার ভিত্তি। সাধারণত ৫ বছর মেয়াদি এই স্তরে শিশুদের একদম শূন্য থেকে শুরু করা হয়।

পাঠ্যক্রম: এখানে নূরানি পদ্ধতিতে কোরআন তিলাওয়াত শেখানো হয়। পাশাপাশি বাংলা, গণিত, ইংরেজি ও ইতিহাস পড়ানো হয়।

উদ্দেশ্য: একজন শিক্ষার্থী যেন শুদ্ধভাবে কোরআন পড়তে পারে এবং জাগতিক প্রাথমিক শিক্ষায় পিছিয়ে না থাকে। এই স্তরেই শিশুদের নামাজ, দোয়া ও প্রাথমিক আদব-কায়দা শেখানো হয়।

২. নিম্ন মাধ্যমিক স্তর: মারহালাতুল মুতাওয়াসসিতাহ

এই স্তরটি ৩ বছরের। এখান থেকেই মূলত কওমি শিক্ষার মূল ধারা বা ‘দরসে নেজামি’ শুরু হয়।

মিজান (১ম বছর): এই ক্লাসের মূল বিষয় হলো আরবি শব্দের রূপান্তর। আরবি একটি শব্দ থেকে কীভাবে শত শত শব্দ তৈরি হয়, তা এখানে শেখানো হয়। একে বলা হয় ‘ছরফ’।

নাহবেমীর (২য় বছর): এখানে আরবি বাক্যের গঠন শেখানো হয়। একটি বাক্যে শব্দের শেষ হরফে কেন পেশ বা জের হবে, তার নিয়মাবলি এখানে শুরু হয়।

See More  খুব সহজে ভাব সম্প্রসারণ লেখার নিয়ম 2026

হেদায়াতুন্নাহু (৩য় বছর): এটি ২য় বছরের ব্যাকরণ শিক্ষার আরও একটু উন্নত রূপ। এখানে ছোট ছোট আরবি গল্পের বইও পড়ানো হয় যাতে শিক্ষার্থীর শব্দভাণ্ডার সমৃদ্ধ হয়।

৩. মাধ্যমিক স্তর: মারহালাতুল সানাবিয়া আল-আম্মাহ (SSC সমমান)

এই স্তরটি ২ বছরের এবং এটি শিক্ষার্থীর মেধা যাচাইয়ের একটি বড় ধাপ।

কাফিয়া (১ম বছর): ‘কাফিয়া’ কিতাবটি আরবি ব্যাকরণের জন্য বিশ্ববিখ্যাত। এটি বেশ সংক্ষিপ্ত কিন্তু অত্যন্ত গভীর। এই ক্লাসে শিক্ষার্থীকে যুক্তি দিয়ে ব্যাকরণ বুঝতে হয়।

শরহে জামী (২য় বছর): কাফিয়ার ব্যাখ্যাগ্রন্থ হলো এই শরহে জামী। এই স্তরে এসে একজন শিক্ষার্থী মোটামুটি সাবলীলভাবে আরবি কিতাব পড়ার যোগ্যতা অর্জন করে। পাশাপাশি এখানে মানতিক বা যুক্তিবিদ্যা পড়ানো শুরু হয়।

৪. উচ্চ মাধ্যমিক স্তর: মারহালাতুল সানাবিয়া আল-উলয়া (HSC সমমান)

এই স্তরটি ২ বছরের। এখান থেকেই সরাসরি ইসলামি আইন (ফিকহ) এবং কোরআনের তাফসিরের পাঠ শুরু হয়।

শরহে বেকায়াহ (১ম বছর): এখানে ইসলামি শরিয়তের দৈনন্দিন মাসআলা-মাসায়েল (পবিত্রতা, নামাজ, রোজা ইত্যাদি) বিস্তারিত দলিলের মাধ্যমে শেখানো হয়।

জালালাইন (২য় বছর): এই ক্লাসের মূল আকর্ষণ হলো ‘তাফসিরে জালালাইন’। এটি কোরআনের একটি সংক্ষিপ্ত কিন্তু সারগর্ভ ব্যাখ্যা। শিক্ষার্থী পুরো কোরআনের একটি সম্যক ধারণা লাভ করে এই ক্লাসে।

৫. স্নাতক স্তর: মারহালাতুল ফজিলাত (ডিগ্রি/অনার্স সমমান)

এই স্তরটি ২ বছর মেয়াদি। এখানে হাদিস এবং জটিল ফিকহ শাস্ত্রের উচ্চতর কিতাব পড়ানো হয়।

মেশকাত (১ম ও ২য় বছর): এখানে প্রধান কিতাব হলো ‘মেশকাতুল মাসাবীহ’। এটি হাদিসের এমন একটি সংকলন যেখানে জীবনের প্রায় সব বিষয়ের হাদিস রয়েছে। এর পাশাপাশি ‘হেদায়া’ নামক কিতাব পড়ানো হয়, যা ইসলামি আইনশাস্ত্রের অন্যতম সেরা কিতাব। এখানে যুক্তি, দর্শন এবং আধুনিক বিভিন্ন সমস্যার ইসলামি সমাধান নিয়ে আলোচনা হয়।

৬. মাস্টার্স স্তর: মারহালাতুল তাকমিল (দাওরায়ে হাদিস)

এটিই কওমি মাদ্রাসার সর্বোচ্চ স্তর। এটি সাধারণত ১ বছরের কোর্স এবং এটি বর্তমানে সরকারিভাবে মাস্টার্স (ইসলামিক স্টাডিজ) সমমান।

See More  ১৪ ফেব্রুয়ারি ভালোবাসা দিবস কেন? এর ইতিহাস কী

দাওরায়ে হাদিস: এই ক্লাসে হাদিসের মৌলিক ১০টি কিতাব পড়ানো হয়। এর মধ্যে বুখারি শরিফ, মুসলিম শরিফ, তিরমিজি শরিফ, আবু দাউদ শরিফ অন্যতম।

পদ্ধতি: এখানে উস্তাদগণ প্রতিটি হাদিসের সনদ (সূত্র), মতন (মূল পাঠ) এবং এর প্রেক্ষাপট বিস্তারিত ব্যাখ্যা করেন। দাওরায়ে হাদিস শেষ করার পর একজন শিক্ষার্থী ‘মওলানা’ উপাধি পান এবং তিনি দ্বীনের যেকোনো বিষয়ে ফতোয়া ও আলোচনার যোগ্যতা অর্জন করেন।

৭. উচ্চতর গবেষণা স্তর (তাকাসসুস)

দাওরায়ে হাদিস শেষ করার পর কেউ যদি বিশেষ কোনো বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হতে চান, তবে তিনি ১ থেকে ৩ বছর মেয়াদি গবেষণামূলক কোর্স করতে পারেন।

তাকাসসুস ফিল ফিকহ (ইফতা): যারা মুফতি হতে চান। তারা এখানে ইসলামি আইন ও ফতোয়া দেওয়ার পদ্ধতি শেখেন।

তাকাসসুস ফিল আদব: আরবি সাহিত্যে পাণ্ডিত্য অর্জনের জন্য।

তাকাসসুস ফিত তাফসির: কোরআনের গভীর গবেষণার জন্য।

সারসংক্ষেপ টেবিল

স্তরের নাম সমমান মেয়াদ মূল বিষয়
ইবতিদাইয়্যাহ প্রাথমিক ৫ বছর কোরআন ও বেসিক শিক্ষা
মুতাওয়াসসিতাহ নিম্ন মাধ্যমিক ৩ বছর আরবি ব্যাকরণ (নাহু-ছরফ)
সানাবিয়া আম্মাহ এসএসসি ২ বছর উচ্চতর ব্যাকরণ ও সাহিত্য
সানাবিয়া উলয়া এইচএসসি ২ বছর ফিকহ ও কোরআন তাফসির
ফজিলাত ডিগ্রি/অনার্স ২ বছর হাদিস ও উচ্চতর ফিকহ
তাকমিল মাস্টার্স ১ বছর সিহাহ সিততাহ (হাদিস)

কওমি মাদ্রাসার এই পুরো শিক্ষাসফর একজন মানুষকে কেবল আলেম বানায় না, বরং তাকে ধৈর্য, নৈতিকতা এবং গবেষণাধর্মী মনন তৈরি করতে সাহায্য করে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *