শবে মেরাজের গুরুত্ব ও ফজিলত সম্পর্কে বলতে গেলে শবে মেরাজ ইসলামের একটি অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ রজনী। এই রাতে আল্লাহ তাআলা নবীজি হযরত মুহাম্মদ ﷺ–কে বিশেষ সম্মানে ভূষিত করেন এবং উম্মতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ উপহার প্রদান করেন। শবে মেরাজের সবচেয়ে বড় ফজিলত হলো পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ হওয়া, যা মুমিনের জন্য আল্লাহর সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কের মাধ্যম। এই রাত আল্লাহর কুদরত, রহমত ও নবীজির উচ্চ মর্যাদার স্মারক। শবে মেরাজে ইবাদত, দোয়া ও তওবা করলে আল্লাহ তাআলার নৈকট্য লাভ করা যায় এবং আত্মশুদ্ধির সুযোগ সৃষ্টি হয়।
শবে মেরাজের গুরুত্ব ও ফজিলত
ইসলামের ইতিহাসে শবে মেরাজ এক অতুলনীয়, মহিমান্বিত ও তাৎপর্যপূর্ণ রাত। এই রাত আল্লাহ তাআলার কুদরত, রাসূলুল্লাহ ﷺ–এর বিশেষ মর্যাদা এবং মুসলিম উম্মাহর জন্য অনন্য নেয়ামতের স্মারক। শবে মেরাজ শুধু একটি ঐতিহাসিক ঘটনা নয়, বরং এটি ঈমান, ইবাদত ও আত্মশুদ্ধির এক গভীর শিক্ষা বহন করে।
শবে মেরাজ কী
‘মেরাজ’ শব্দের অর্থ হলো ঊর্ধ্বগমন। ইসলামী পরিভাষায়, শবে মেরাজ সেই পবিত্র রাত, যেদিন মহানবী হযরত মুহাম্মদ ﷺ আল্লাহ তাআলার বিশেষ ইচ্ছায় মক্কা থেকে বায়তুল মুকাদ্দাস পর্যন্ত ভ্রমণ করেন (ইসরা), এরপর সেখান থেকে আকাশসমূহ অতিক্রম করে সিদরাতুল মুনতাহা পর্যন্ত গমন করেন (মেরাজ)। এই অলৌকিক সফর মানব ইতিহাসে এক অনন্য ঘটনা।
মেরাজের পটভূমি
শবে মেরাজ সংঘটিত হয় নবুয়তের এক কঠিন সময়ের পর। প্রিয় স্ত্রী হযরত খাদিজা (রা.) এবং অভিভাবক আবু তালিবের ইন্তেকালের ফলে নবীজি ﷺ গভীর দুঃখে নিমজ্জিত ছিলেন। তায়েফে গমন করে তিনি প্রত্যাখ্যাত হন এবং নির্যাতনের শিকার হন। ঠিক এই দুঃসময়েই আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রিয় রাসূলকে সান্ত্বনা ও সম্মান দিতে শবে মেরাজ দান করেন।
ইসরা ও মেরাজের ঘটনা
এই রাতে রাসূলুল্লাহ ﷺ–কে বোরাক নামক বাহনে করে প্রথমে মক্কা থেকে বায়তুল মুকাদ্দাসে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তিনি পূর্ববর্তী নবীদের ইমামতি করে নামাজ আদায় করেন। এরপর তিনি একের পর এক সাত আসমান অতিক্রম করেন। প্রত্যেক আসমানে তিনি আদম (আ.), ঈসা (আ.), মূসা (আ.), ইব্রাহিম (আ.)সহ বহু নবীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। শেষপর্যন্ত তিনি সিদরাতুল মুনতাহা পর্যন্ত পৌঁছান, যেখানে আল্লাহ তাআলার বিশেষ নৈকট্য লাভ করেন।
পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের ফরজ হওয়া
শবে মেরাজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও ফজিলতপূর্ণ দিক হলো পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ হওয়া। প্রথমে পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ করা হলেও, হযরত মূসা (আ.)–এর পরামর্শে রাসূল ﷺ বারবার আল্লাহর কাছে আবেদন করেন এবং শেষ পর্যন্ত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ নির্ধারিত হয়। অথচ সওয়াব দেওয়া হবে পঞ্চাশ ওয়াক্তের সমান। এটি আল্লাহর অসীম রহমতের এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
নামাজের মর্যাদা ও শিক্ষা
নামাজ মুমিনের জন্য মেরাজস্বরূপ। শবে মেরাজ আমাদের শিক্ষা দেয় যে, আল্লাহর নৈকট্য লাভের সর্বোত্তম মাধ্যম হলো নামাজ। যে ব্যক্তি নিয়মিত, মনোযোগ ও খুশু-খুজুর সঙ্গে নামাজ আদায় করে, সে আল্লাহর সঙ্গে গভীর সম্পর্ক স্থাপন করতে সক্ষম হয়।
শবে মেরাজের ফজিলত
শবে মেরাজ অত্যন্ত বরকতময় রাত। এই রাতে আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাদের প্রতি বিশেষ রহমত নাযিল করেন। অনেক আলেমের মতে, এই রাতে ইবাদত, দোয়া ও ইস্তেগফারের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। যদিও নির্দিষ্ট কোনো নফল ইবাদত বাধ্যতামূলক নয়, তবে নফল নামাজ, কোরআন তিলাওয়াত, জিকির ও দোয়া করা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ।
ঈমান শক্তিশালী করার রাত
শবে মেরাজ আমাদের ঈমানকে দৃঢ় করে। যুক্তির ঊর্ধ্বে উঠে আল্লাহর কুদরতকে বিশ্বাস করার শিক্ষা এই রাত দেয়। যারা এই ঘটনা বিশ্বাস করে, তারা আল্লাহ ও রাসূলের প্রতি পূর্ণ আনুগত্যের পরিচয় দেয়।
আত্মশুদ্ধি ও তওবার সুযোগ
শবে মেরাজ আত্মসমালোচনা ও আত্মশুদ্ধির এক সুবর্ণ সুযোগ। এই রাতে একজন মুমিন তার গুনাহের জন্য তওবা করতে পারে এবং ভবিষ্যতে সঠিক পথে চলার অঙ্গীকার করতে পারে। আল্লাহ তাআলা তওবাকারীদের ভালোবাসেন এবং আন্তরিক তওবা কবুল করেন।
সামাজিক ও নৈতিক শিক্ষা
মেরাজের ঘটনায় জান্নাত ও জাহান্নামের বিভিন্ন দৃশ্য দেখানো হয়, যা মানুষকে ভালো কাজের প্রতি উৎসাহিত এবং পাপ থেকে বিরত থাকতে সতর্ক করে। এটি সমাজে ন্যায়, সততা ও মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার প্রেরণা দেয়।
শবে মেরাজ উদযাপনের সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি
শবে মেরাজ উদযাপন মানে শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয়। এর মূল উদ্দেশ্য হলো নামাজের গুরুত্ব অনুধাবন, আল্লাহর নৈকট্য লাভ এবং চরিত্র সংশোধন। বিদআত ও অপ্রমাণিত আমল থেকে বিরত থেকে সুন্নাহভিত্তিক ইবাদতের প্রতি মনোযোগী হওয়াই শ্রেয়।
উপসংহার
শবে মেরাজ ইসলামের এক মহামূল্যবান রাত, যা আল্লাহ ও বান্দার সম্পর্ককে নতুনভাবে জাগ্রত করে। এই রাত আমাদের শেখায় দুঃখের পর আল্লাহর রহমত আসে, নামাজই মুক্তির চাবিকাঠি এবং ঈমানই জীবনের প্রকৃত শক্তি। শবে মেরাজকে উপলক্ষ করে আমরা যদি নামাজে যত্নশীল হই, গুনাহ পরিহার করি এবং আল্লাহর দিকে ফিরে আসি, তবে এই রাত আমাদের জীবনে সত্যিকার পরিবর্তন এনে দিতে পারে।

