পবিত্র শবে মেরাজের নবীজির মেরাজের ঘটনা ও ইতিহাস

নবীজি হযরত মুহাম্মদ ﷺ এর মেরাজের ঘটনা ইসলামের এক অলৌকিক ও গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এক রাতে আল্লাহ তাআলা তাঁকে মক্কা থেকে বায়তুল মুকাদ্দাস পর্যন্ত ভ্রমণ করান, যাকে ইসরা বলা হয়। এরপর সেখান থেকে তিনি আকাশসমূহ অতিক্রম করে সিদরাতুল মুনতাহা পর্যন্ত গমন করেন, যা মেরাজ নামে পরিচিত। এই সফরে তিনি পূর্ববর্তী নবীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং জান্নাত ও জাহান্নামের নিদর্শন দেখেন। মেরাজের রাতে মুসলমানদের জন্য পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ করা হয়। এই ঘটনা আল্লাহর কুদরত ও নবীজির মর্যাদার অনন্য প্রমাণ।

নবীজির মেরাজের ঘটনা ও ইতিহাস 

নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর মেরাজের ঘটনাটি ইসলামের ইতিহাসে একটি বিস্ময়কর এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মোড়। আপনি যেহেতু সম্পূর্ণ বিস্তারিত জানতে চেয়েছেন, তাই এই মহিমান্বিত সফরের প্রতিটি ধাপ নিচে তুলে ধরা হলো:

প্রেক্ষাপট: শোকের বছর

মেরাজের ঘটনাটি ঘটেছিল এমন এক সময়ে যখন নবীজি ব্যক্তিগত এবং মানসিকভাবে খুব কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলেন। তাঁর প্রিয়তম স্ত্রী খাদিজা (রা.) এবং আশ্রয়দাতা চাচা আবু তালিব ইন্তেকাল করেছিলেন। তায়েফের ময়দানে তিনি চরম লাঞ্ছনার শিকার হয়েছিলেন। এই কঠিন সময়ে আল্লাহ তায়ালা তাঁর প্রিয় বন্ধুকে সান্ত্বনা দিতে এবং নিজের ক্ষমতা প্রদর্শনের জন্য সান্নিধ্যে ডেকে নেন।

১. সফরের শুরু ও বক্ষ বিদীর্ণ করা

এক রাতে নবীজি (সা.) উম্মে হানির ঘরে অথবা কাবার হাতিমে ঘুমিয়ে ছিলেন। জিবরাঈল (আ.) ফেরেশতাদের একটি দল নিয়ে সেখানে উপস্থিত হন। প্রথমে নবীজির বুক চিরে (শকুস সদর) জমজমের পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলা হয় এবং তাঁর হৃদয়ে ঈমান ও হিকমত (প্রজ্ঞা) ভরে দেওয়া হয়। এরপর তাঁর সামনে ‘বোরাক’ নামক একটি বিদ্যুৎগতিসম্পন্ন সাদা সওয়ারি আনা হয়, যার প্রতিটি কদম ছিল দৃষ্টির শেষ সীমানায়।

২. মসজিদুল আকসায় ‘ইসরা’

মক্কা থেকে মুহূর্তের মধ্যে নবীজি ফিলিস্তিনের জেরুজালেমে অবস্থিত মসজিদুল আকসায় পৌঁছান। সেখানে আগে থেকেই পূর্ববর্তী সমস্ত নবী ও রাসূলগণ উপস্থিত ছিলেন। নবীজি সেখানে তাঁদের নিয়ে দুই রাকাত নামাজ আদায় করেন এবং তিনি ছিলেন সেই জামাতের ইমাম। এই ঘটনার মাধ্যমে প্রমাণিত হয় যে, তিনি সকল নবীর সরদার (সাইয়্যিদুল মুরসালিন)।

See More  দুর্জন বিদ্বান হলেও পরিত্যাজ্য ভাবসম্প্রসারণ বাংলা ২য় পত্র

৩. সাত আসমান ভ্রমণ

মসজিদুল আকসা থেকে শুরু হয় ঊর্ধ্বাকাশ বা মেরাজের মূল সফর। প্রতিটি আসমানের দরজায় জিবরাঈল (আ.) অনুমতি চান এবং প্রহরীরা নবীজিকে স্বাগত জানান।

  • প্রথম আসমান: এখানে আদম (আ.)-এর সাথে সাক্ষাৎ হয়। তিনি নবীজিকে দেখে ‘নেক সন্তান ও নেক নবী’ বলে স্বাগত জানান। নবীজি সেখানে মানুষের রুহদের দেখেন; ডানদিকে জান্নাতিদের রুহ এবং বামদিকে জাহান্নামিদের রুহ।

  • দ্বিতীয় আসমান: এখানে দেখা হয় ঈসা (আ.) এবং ইয়াহইয়া (আ.)-এর সাথে।

  • তৃতীয় আসমান: এখানে ইউসুফ (আ.)-এর সাথে দেখা হয়। নবীজি বর্ণনা করেছেন যে, ইউসুফ (আ.)-কে দুনিয়ার সৌন্দর্যের অর্ধেক দেওয়া হয়েছিল।

  • চতুর্থ আসমান: ইদ্রিস (আ.)-এর সাথে সাক্ষাৎ।

  • পঞ্চম আসমান: হারুন (আ.)-এর সাথে সাক্ষাৎ।

  • ষষ্ঠ আসমান: মুসা (আ.)-এর সাথে দেখা হয়। নবীজি যখন তাঁকে অতিক্রম করে সামনে যাচ্ছিলেন, তখন মুসা (আ.) কেঁদে ফেলেন। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, তাঁর পর একজন যুবক নবী এসেছেন যার উম্মত তাঁর উম্মতের চেয়েও বেশি সংখ্যায় জান্নাতে যাবে।

  • সপ্তম আসমান: এখানে ইব্রাহিম (আ.)-এর সাথে সাক্ষাৎ হয়। তিনি বায়তুল মামুর (ফেরেশতাদের কাবা) এ হেলান দিয়ে বসে ছিলেন। সেখানে প্রতিদিন ৭০ হাজার ফেরেশতা ইবাদতের জন্য প্রবেশ করে যারা আর দ্বিতীয়বার সুযোগ পায় না।

৪. সিদরাতুল মুনতাহা ও জিবরাঈলের বিদায়

সপ্তম আসমান পার হয়ে নবীজি সিদরাতুল মুনতাহা নামক একটি বড় কুল গাছের কাছে পৌঁছান। এর সৌন্দর্য ও রং বর্ণনাতীত। জিবরাঈল (আ.) এখানে এসে থেমে যান এবং বলেন, “এর সামনে যাওয়ার অনুমতি আমার নেই। এক চুল পরিমাণ সামনে বাড়লে আমি নূরের তাজল্লিতে পুড়ে ছাই হয়ে যাব।” এরপর নবীজি আল্লাহর বিশেষ ব্যবস্থাপনায় (যাকে ‘রফ্ রফ্’ বলা হয়) আরও উঁচুতে আরশে আজিমের দিকে এগিয়ে যান।

৫. আল্লাহর দিদার ও বিশেষ উপহার

নবীজি (সা.) পর্দা ছিঁড়ে আল্লাহর একান্ত সান্নিধ্যে উপস্থিত হন। তাঁদের মধ্যে কী কথা হয়েছিল তা সাধারণ মানুষের কল্পনার বাইরে। তবে এই সফরে আল্লাহ তিনটি বিশেষ উপহার দেন:

  1. পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ: শুরুতে ৫০ ওয়াক্ত দেওয়া হলেও মুসা (আ.)-এর পরামর্শে কয়েকবার আল্লাহর কাছে ফিরে গিয়ে নবীজি তা ৫ ওয়াক্তে নিয়ে আসেন। তবে আল্লাহ প্রতিশ্রুতি দেন, এই ৫ ওয়াক্ত আদায় করলেই ৫০ ওয়াক্তের সওয়াব পাওয়া যাবে।

  2. সূরা বাকারার শেষ দুই আয়াত।

  3. শিরক না করলে উম্মতের কবিরা গুনাহ মাফের সুসংবাদ।

See More  ৬০+ বিদ্রোহী কবিতার MCQ প্রশ্নের উত্তর পিডিএফ ২০২৬

৬. জান্নাত ও জাহান্নামের দৃশ্য

ফেরার পথে নবীজি জান্নাত ঘুরে দেখেন, যার মাটি ছিল কস্তুরীর মতো সুগন্ধি। তিনি কাউসার নদী ও প্রাসাদের দৃশ্য দেখেন। পাশাপাশি তিনি জাহান্নামের ভয়াবহ আজাবও দেখেন। যেমন: যারা গিবত করত তারা নিজেদের নখ দিয়ে নিজেদের মুখ আঁচড়াচ্ছিল, আবার যারা এতিমের মাল খেত তাদের আগুনের পাথর খাওয়ানো হচ্ছিল।

৭. মক্কায় ফেরা ও আবু বকরের সত্যয়ন

ভোর হওয়ার আগেই নবীজি মক্কায় ফিরে আসেন। সকালে তিনি যখন কাবার চত্বরে এই ঘটনা বর্ণনা করেন, আবু জাহেল ও কুরাইশরা তা হেসেই উড়িয়ে দেয়। তারা নবীজিকে পরীক্ষা করতে বাইতুল মুকাদ্দাসের খুঁটিনাটি জিজ্ঞেস করে (যা নবীজি আগে কখনও দেখেননি)। আল্লাহ তখন নবীজির চোখের সামনে বাইতুল মুকাদ্দাসের দৃশ্য তুলে ধরেন এবং তিনি প্রতিটি প্রশ্নের সঠিক উত্তর দেন।

যখন কাফেররা আবু বকর (রা.)-এর কাছে গিয়ে এই “অবিশ্বাস্য” গল্পের কথা বলে, তিনি শুধু একটি প্রশ্ন করেছিলেন “মুহাম্মদ (সা.) কি নিজ মুখে এ কথা বলেছেন?” তারা বলল, “হ্যাঁ।” তখন তিনি বলেছিলেন, “তবে তিনি সত্যই বলেছেন।” এই অটল বিশ্বাসের কারণে সেদিন তিনি সিদ্দিক (মহা সত্যবাদী) উপাধি পান।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *