রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উপন্যাসের উক্তিগুলো মানবজীবনের গভীর সত্য খুব সহজ ভাষায় তুলে ধরে। এসব উক্তিতে প্রেম, সম্পর্ক, সমাজ, আত্মসম্মান, নারী-পুরুষের মনস্তত্ত্ব এবং জীবনের দ্বন্দ্ব স্পষ্টভাবে প্রকাশ পায়। একটি ছোট বাক্যের মধ্যেই তিনি মানুষের অনুভূতি, দুর্বলতা ও শক্তির কথা বলে দেন। তাই তার উপন্যাসের উক্তিগুলো পাঠকের মনে দীর্ঘদিন থেকে যায়। এগুলো শুধু সাহিত্যিক সৌন্দর্যের জন্য নয়, জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতার প্রতিফলন হিসেবেও মূল্যবান। আজও এসব উক্তি মানুষকে ভাবতে শেখায় এবং নিজের জীবনকে নতুনভাবে বুঝতে সাহায্য করে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উপন্যাসের উক্তি
কাউকে কোনোদিন ভালোবেসে থাকলে সেই ভালোবাসার দাবি কোনোকালেই শেষ হয় না। পৃথিবীর সব লেনা-দেনা চুকে গেলেও মনের কোনো এক কোণে সেই দাবির রেশ চিরকাল রয়ে যায়, যা মানুষের পিছু ছাড়ে না কোনোদিন।
অন্ধকার যেমন আলোরই অভাব, তেমনি মৃত্যুও জীবনেরই এক গভীর অভাব মাত্র। জীবন যখন শেষ হয়ে যায়, তখন তার সেই শূন্যতা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে একদিন এখানে সবটুকু পূর্ণতায় ভরা ছিল।
সাধারণত মানুষ যখন মনের দিক থেকে খুব বেশি একা হয়ে যায়, তখন সে নিজেকে ব্যস্ত রাখার জন্য অজস্র কাজ খুঁজে নেয়। সেই কাজের ভিড়ে সে আসলে নিজের নিঃসঙ্গতাকেই ঢাকতে চায় অবিরত।
বিয়ের সম্বন্ধটা হলো আইনি অধিকারের বিষয়, কিন্তু ভালোবাসাটা হলো প্রাণের গভীর টান। অধিকার দিয়ে শরীর পাওয়া যায় ঠিকই, কিন্তু ভালোবাসা ছাড়া মানুষের মনের নাগাল পাওয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
ভুল করারও একটা মহত্ব আছে। যে মানুষ কোনোদিন ভুল করেনি, সে আসলে নতুন কিছু করার সাহসই দেখায়নি। ভুল থেকেই মানুষ সত্যের পথে হাঁটার সবচেয়ে বড় শিক্ষাটা লাভ করে জীবনের কোনো এক বাঁকে।
ভালোবাসার মর্যাদা রক্ষা করাটা কেবল প্রিয়জনকে পাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। যাকে পাওয়া গেল না, তাকে নিজের মনের পবিত্র মন্দিরে আজীবন সাজিয়ে রাখার মধ্যেও এক গভীর সার্থকতা লুকিয়ে থাকে।
মানুষ যখন কারো ওপর খুব বেশি বিশ্বাস হারায়, তখন সে আসলে পুরো পৃথিবীর ওপর থেকেই বিশ্বাস হারিয়ে ফেলে। সেই অবিশ্বাস তাকে এমন এক নিঃসঙ্গতার দিকে ঠেলে দেয় যেখান থেকে ফেরা বড় কঠিন।
সত্যিই কি মানুষ মানুষকে পুরোপুরি চিনতে পারে? আমরা তো কেবল মানুষের বাইরের আবরণটুকুই দেখি। তার অন্তরের গহীনে কত শত না বলা গল্প আর দীর্ঘশ্বাস লুকিয়ে থাকে, তার খবর কজনই বা রাখে।
পৃথিবীতে সবচেয়ে বড় কষ্ট হলো প্রিয় মানুষের অবহেলা সহ্য করা। বাইরের মানুষ গালি দিলে যতটা না লাগে, কাছের মানুষের একটুখানি নীরবতা তার চেয়েও হাজার গুণ বেশি বুক ফাটিয়ে দেয় অপমানে।
অধিকার ছাড়তে শেখাও এক ধরণের বড় মনের পরিচয়। যা তোমার নয়, তাকে জোর করে ধরে রাখার চেষ্টা করাটা কেবল বোকামি নয়, বরং নিজেকে ছোট করার শামিল। ত্যাগের মাঝেই আসল বীরত্ব।
সংসারে আমরা যাকে বড় করে দেখি, হয়তো পরকালে তার কোনো মূল্যই থাকবে না। আমাদের ছোট ছোট ভালো কাজগুলোই হয়তো শেষ বিচারে আমাদের সবচেয়ে বড় পরিচয় হয়ে দাঁড়াবে কোনো এক মহাপ্রলয়ে।
প্রেম হলো সেই আগুন যা জ্বলে উঠলে সবকিছু পুড়িয়ে ছারখার করে দেয়, আবার এই আগুনেই মানুষ নিজের সত্তাকে শুদ্ধ করে নেওয়ার এক অদ্ভুত সুযোগ পায়। প্রেম মানুষকে নিঃস্ব করে, আবার পূর্ণও করে।
মানুষের মন হলো আয়নার মতো। সেখানে যেমন সুন্দর প্রতিচ্ছবি ভেসে ওঠে, তেমনি একটুখানি ধুলো জমলে সব ঝাপসা হয়ে যায়। মনের সেই স্বচ্ছতা বজায় রাখাটাই জীবনের সবচেয়ে কঠিন কাজগুলোর একটি।
অপেক্ষা হলো ভালোবাসার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। যে মানুষটি বছরের পর বছর কোনো আশা ছাড়াই কারো তরে পথ চেয়ে বসে থাকতে পারে, সেই জানে ভালোবাসার আসল গভীরতা কতখানি অতলস্পর্শী হতে পারে।
নিজের দোষ স্বীকার করা মানেই হেরে যাওয়া নয়। বরং এটি হলো নিজের ভুল শুধরে নিয়ে নতুন করে পথ চলার প্রথম পদক্ষেপ। যারা নিজের ভুল বুঝতে পারে, তারাই পৃথিবীতে সত্যিকারের জ্ঞানী মানুষ।
সমাজ মানুষকে এক ছাঁচে গড়তে চায়, কিন্তু প্রকৃতি মানুষকে দেয় ভিন্ন ভিন্ন রূপ। সমাজের সেই শৃঙ্খল ভেঙে যখন কেউ নিজের স্বকীয়তা প্রকাশ করে, তখন তাকে অনেক বাধার সম্মুখীন হতে হয়।
সুখ যখন আসে তখন আমরা তাকে খুব স্বাভাবিক বলে মেনে নিই। কিন্তু যখনই দুঃখের ছায়া ঘনায়, তখন আমরা বিধাতার কাছে হাজারটা অভিযোগ করি। জীবনের পূর্ণতা তো সুখ আর দুঃখের মিলনেই।
মানুষের চোখের জল সবসময় কষ্টের প্রতীক নয়। কখনও কখনও গভীর আনন্দের পরশেও মানুষের চোখ ভিজে ওঠে। সেই কান্নার ভাষা বোঝার মতো হৃদয় আমাদের এই যান্ত্রিক পৃথিবীতে খুব কম মানুষেরই আছে।
অতীতকে আঁকড়ে ধরে বসে থাকা মানে বর্তমানকে গলা টিপে হত্যা করা। যা চলে গেছে তাকে যেতে দিতে হয়, না হলে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সব পথ রুদ্ধ হয়ে যায় চিরদিনের তরে।
বন্ধুত্ব এবং ভালোবাসা—এই দুটির মধ্যে পার্থক্য করা খুব কঠিন। কখনও বন্ধুত্ব প্রেমে রূপ নেয়, আবার কখনও গভীর প্রেম শেষ পর্যন্ত এক নিরেট বন্ধুত্বের আশ্রয়ে এসে শান্তি খুঁজে পায় আমাদের জীবনে।
রূপের মায়া ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু গুণের মায়া চিরস্থায়ী। চামড়ার ওপর যে সৌন্দর্য থাকে তা সময়ের সাথে সাথে মলিন হয়ে যায়, কিন্তু মনের সৌন্দর্য মানুষকে সারাজীবন সবার হৃদয়ে বাঁচিয়ে রাখে শ্রদ্ধার সাথে।
কথা বলতে পারাটা একটা শিল্প, কিন্তু চুপ থাকতে পারাটা এক বিশাল সাধনা। নীরবতা কখনও কখনও হাজারো বক্তৃতার চেয়েও বেশি প্রভাবশালী হতে পারে, যদি তা সঠিক সময়ে আর সঠিক জায়গায় ব্যবহৃত হয়।
মানুষ যখন মরীচিকার পিছু ছোটে, তখন সে হাতের কাছে থাকা আসল সুখটাকেও হারিয়ে ফেলে। কল্পনার পেছনে ছুটতে গিয়ে বাস্তবের মাটি হারানো মানুষের সংখ্যা এই পৃথিবীতে নেহাত কম নয় কোনোভাবেই।
কখনও কখনও হেরে যাওয়াটাও এক ধরণের জয়। যখন কেউ অন্যের খুশির জন্য নিজের দাবি ছেড়ে দেয়, তখন সে হারলেও নৈতিকভাবে অনেক বড় হয়ে যায় নিজের আর সবার কাছে এক অনন্য দৃষ্টান্তে।
স্মৃতি হলো এক ধরণের অলঙ্কার। যন্ত্রণার স্মৃতি যেমন আমাদের দগ্ধ করে, তেমনি সুখের স্মৃতিগুলো আমাদের নতুন করে বাঁচার প্রেরণা জোগায় ঘোর বিপদেও। স্মৃতির হাত ধরে মানুষ পুরো জীবন কাটিয়ে দেয়।
সহজ কথা সহজভাবে বলাটাই হলো সবচেয়ে কঠিন কাজ। আমরা অকারণে সব বিষয়কে জটিল করে তুলি আর জীবনটাকে অতিষ্ঠ করে তুলি। অথচ একটু সরলতা জীবনকে অনেক বেশি সুন্দর করতে পারতো।
পুরুষের প্রেম অনেকটা আগুনের মতো, যা হঠাৎ জ্বলে ওঠে আবার হঠাৎ নিভে যায়। কিন্তু নারীর প্রেম হলো প্রদীপের শিখার মতো, যা নিভু নিভু করলেও শেষ পর্যন্ত জ্বলতে থাকে একনিষ্ঠভাবে।
মানুষ যখন বিপদে পড়ে তখন সে ভগবানের চরণে আশ্রয় খোঁজে। অথচ সুখের দিনে যদি সে একটু কৃতজ্ঞ থাকতো, তবে হয়তো তার জীবনের অনেক বিপদই খুব সহজে কেটে যেতে পারতো মায়ার ছোঁয়ায়।
একাকীত্ব মানেই নিঃসঙ্গতা নয়। নির্জনে বসে নিজের সাথে কথা বলা এবং নিজেকে চেনা হলো এক ধরণের আধ্যাত্মিক সাধনা। যারা একাকীত্বকে উপভোগ করতে জানে, তারা কখনও এই পৃথিবীতে একা হয় না।
ভালোবাসা অনেকটা লতার মতো। এটি যেমন কোমল তেমনি দৃঢ়। একবার যদি এটি কাউকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরে, তবে তা থেকে মুক্তি পাওয়া মানুষের পক্ষে প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায় জীবনের শেষদিন পর্যন্ত।
জীবনটা একটা ছোট গল্পের মতো হওয়া উচিত। যার শুরুটা হবে সুন্দর, মাঝখানটা হবে কৌতুহলপূর্ণ আর শেষটা হবে এক গভীর বিষাদ মাখা তৃপ্তির। জীবনের প্রতিটি অধ্যায় যেন এক একটা নতুন শিক্ষা।
স্বার্থপর মানুষ কখনও সুখী হতে পারে না। কারণ সুখ তো হলো অন্যের মাঝে বিলিয়ে দেওয়ার নাম। যে কেবল নিজের টুকু গুছিয়ে রাখতে ব্যস্ত থাকে, সে আসলে জীবনের আসল স্বাদ থেকে বঞ্চিত।
কখনও কখনও চোখের সামনে যা দেখি তা সবসময় সত্যি হয় না। সত্যের তল পেতে হলে অন্তরের চোখ দিয়ে দেখতে হয়। কারণ বাইরের পৃথিবীটা মায়ার জালে ঘেরা, যা আমাদের প্রতিনিয়ত বিভ্রান্ত করে।
প্রতিটি মানুষের ভেতরে একজন করে শিল্পী লুকিয়ে থাকে। কেউ তা প্রকাশ করতে পারে, কেউ পারে না। কিন্তু সৃষ্টির সেই ব্যাকুলতা প্রতিটি হৃদয়েই কমবেশি বিদ্যমান যা তাকে প্রতিনিয়ত অস্থির করে রাখে।
ধর্ম হলো মানুষের মনের বিশ্বাসের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এক সুউচ্চ ইমারত। কিন্তু মানুষের মধ্যে যখন দয়া আর মায়া থাকে না, তখন সেই ধর্মের পোশাকটা বড় বেশি বেমানান আর কদর্য মনে হয়।
বিচ্ছেদ মানেই সব শেষ নয়। বিচ্ছেদ হলো একে অপরের গুরুত্ব বোঝার এক নতুন সুযোগ। দূরে গেলেই বোঝা যায় মানুষটি আমাদের জীবনে কতটা জায়গা জুড়ে ছিল আর কতটা প্রয়োজন ছিল তার অস্তিত্ব।
সংসার হলো একটা সংগ্রাম ক্ষেত্র। এখানে প্রতিদিন প্রতিটি মুহূর্তে লড়তে হয় নিজের সাথে আর পারিপার্শ্বিকতার সাথে। এই লড়াইয়ে যারা হাল ছাড়ে না, শেষ পর্যন্ত জয়ী হয়ে তারাই ইতিহাস হয়ে থাকে।
ক্ষমা করা হলো মানুষের সবচেয়ে বড় গুণ। যে ক্ষমা করতে জানে, সে আসলে নিজের মনের ওপর থেকে এক বিশাল বোঝা নামিয়ে ফেলে। ক্ষমার মাধ্যমে শত্রুতা ভুলে আবার নতুন করে বন্ধুত্ব গড়া সম্ভব।
বড় বড় ত্যাগের চেয়ে ছোট ছোট মায়া আর যত্নই জীবনকে বেশি পূর্ণ করে তোলে। প্রতিদিনের এই সামান্য ভালোবাসাগুলোই আসলে আমাদের বেঁচে থাকার রসদ জোগায় আর পৃথিবীকে সুন্দর করে তোলে সবার কাছে।
মানুষের চরিত্র বোঝা যায় তার ব্যবহারের মাধ্যমে। যার ভেতরে যতটা গভীরতা আছে, তার ব্যবহার ততটাই নম্র আর ভদ্র হয়। দাম্ভিকতা কেবল সেই মানুষের থাকে যার ভেতরে আসলে কিছুই নেই শূন্য ছাড়া।
স্বপ্ন দেখা বন্ধ করা মানেই হলো জীবনের ইতি টানা। স্বপ্নই আমাদের আগামীর পথে চলতে শেখায় এবং কঠিন পরিস্থিতির মাঝেও এক চিলতে হাসির খোরাক জোগায় অবচেতন মনে সারাক্ষণ।
জ্ঞান অর্জনের চেয়ে বোধ শক্তি থাকা অনেক বেশি জরুরি। অনেক শিক্ষিত মানুষও বোধহীন হতে পারে, আবার একজন নিরক্ষর মানুষও তার বোধ দিয়ে পৃথিবীকে আলোর পথ দেখাতে পারে খুব সুন্দরভাবে।
শান্তি মানে কেবল যুদ্ধের অভাব নয়। মনের ভেতরে যখন কোনো উদ্বেগ থাকে না এবং মানুষ নিজের কাজ নিয়ে তৃপ্ত থাকে, তখনই তাকে প্রকৃত শান্তি বলা যায়। শান্তির খোঁজ বাইরের জগতে নয়, নিজের ভেতরেই।
কাউকে ঘৃণা করা মানে হলো নিজের অমূল্য সময় নষ্ট করা। ঘৃণার চেয়ে ভালোবাসা অনেক বেশি শক্তিশালী। কাউকে ভালোবাসলে নিজের মনটা যেমন ভরে ওঠে, তেমনি অন্যকেও নতুন করে বাঁচতে শেখানো যায়।
সম্পর্কগুলো কাঁচের মতো। একবার ভেঙে গেলে তা জোড়া লাগানো খুব কঠিন, আর জোড়া লাগলেও ফাটলটা চিরকাল রয়ে যায়। তাই সম্পর্কের যত্ন নেওয়া উচিত প্রতিটি দিন আর প্রতিটি মুহূর্ত অত্যন্ত সতর্কভাবে।
মানুষ তার কাজের মাধ্যমেই অমর হয়ে থাকে। শরীরের বিনাশ আছে কিন্তু কর্মের কোনো ধ্বংস নেই। ভালো কাজগুলো যুগ যুগ ধরে মানুষের মনে বেঁচে থাকে আর প্রেরণা জোগায় পরবর্তী প্রজন্মকে প্রতিনিয়ত।
অধিকার যখন অত্যাচারে পরিণত হয়, তখন সেই সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসাই বুদ্ধিমানের কাজ। নিজের সম্মান বিসর্জন দিয়ে কোনো সম্পর্কে টিকে থাকাটা কোনো বীরত্ব নয়, বরং তা হলো আত্মহত্যার শামিল।
প্রকৃতির সাথে মানুষের এক গভীর মিতালি রয়েছে। আমরা যখন প্রকৃতির কাছে যাই, তখন আমাদের মনের সব গ্লানি মুছে যায়। প্রকৃতি হলো আমাদের সবচেয়ে বড় শিক্ষক আর চিরকালীন শান্তির এক নিরাপদ আশ্রয়।
মরণ যখন দুয়ারে আসে, তখন সব হিসাব নিকাশ তুচ্ছ হয়ে যায়। তখন কেবল মনে পড়ে সেই মানুষগুলোর কথা যাদের আমরা ভালোবাসতে চেয়েও পারিনি বা যাদের কথা আমরা অকারণে এড়িয়ে গেছি সারা জীবন।
শেষ বলে কিছু নেই। জীবনের প্রতিটি শেষ আসলে এক নতুন শুরুরই পূর্বাভাস। এক সূর্য ডুবে গেলে অন্য নক্ষত্ররা জেগে ওঠে রাতের আকাশে, ঠিক তেমনি এক সম্ভাবনা শেষ হলে অন্য সম্ভাবনার জন্ম হয়।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উপন্যাসের ভালোবাসার উক্তি
অল্প নিয়ে সন্তুষ্ট থাকা মানুষের পক্ষেই সম্ভব, কিন্তু ভালোবাসা তো অল্পে তৃপ্ত হয় না। ভালোবাসা সবসময় চায় সবটুকু পেতে, আর সেই সব পাওয়ার নেশাই মানুষকে জীবনের সবচেয়ে বড় ঝুঁকিতে ফেলে দেয়।
মানুষ যখন নিজেকে খুব বড় করে দেখতে শুরু করে, তখন সে আসলে নিজের চারিদিকে এক বিশাল দেয়াল তুলে ফেলে। সেই দেয়ালের কারণে সে অন্যের দুঃখ আর ভালোবাসা দেখতে পায় না, একলা হয়ে যায়।
বিচ্ছেদ মানেই যে হৃদয়ের শেষ, তা তো নয়। অনেক সময় বিচ্ছেদের পরেই ভালোবাসা তার আসল রূপ পায়। কাছে থাকলে যে মায়া ঢাকা পড়ে থাকে, দূরে গেলে সেই মায়াই ধ্রুবতারার মতো পথ দেখায়।
সংসারে আমরা যাকে ঘৃণা করি, হয়তো তার ভেতরেও এক গভীর সত্য লুকিয়ে আছে যা আমরা বুঝতে পারিনি। মানুষকে বিচার করার আগে তার পরিস্থিতির কথা ভাবা উচিত, কারণ বিচারক হওয়া খুব সহজ।
প্রেমের আনন্দ থাকে স্বল্পক্ষণ, কিন্তু তার বেদনা থাকে চিরকাল। সেই বেদনাকে যে মানুষ অমূল্য সম্পদ হিসেবে বুকের ভেতরে আগলে রাখতে পারে, সেই জীবনের আসল সার্থকতা খুঁজে পায় কোনো এক বিষণ্ণ সন্ধ্যায়।
অধিকারের সীমা যেখানে শেষ হয়, শ্রদ্ধার সীমা সেখান থেকেই শুরু হওয়া উচিত। জোর করে কাউকে আপন করা যায় না, মানুষের মন কেবল মায়া আর বিশ্বাসের সুতো দিয়ে বাঁধা পড়ে থাকে সারাটি জীবন।
প্রতিটি মানুষের জীবনেই এমন একটা সময় আসে যখন সে একা হাঁটতে ভয় পায় না। সেই একাকীত্ব তাকে শেখায় কীভাবে নিজের সত্তাকে সম্মান করতে হয় আর পৃথিবীর ভিড়ে নিজেকে চিনে নিতে হয়।
আমরা জীবনের সব হিসাব মেলাতে চাই, কিন্তু জীবন তো গণিত নয়। জীবনের অনেক প্রশ্ন এমন থাকে যার কোনো উত্তর হয় না, শুধু সময়ের সাথে সাথে সেই প্রশ্নগুলো সহনীয় হয়ে ওঠে আমাদের কাছে।
ভালোবাসা অনেকটা আকাশের মতো, যার কোনো শেষ নেই। আমরা কেবল তার নিচে দাঁড়িয়ে মুগ্ধ হয়ে চেয়ে থাকতে পারি। কেউ আকাশকে মুঠোয় ভরতে পারে না, কেবল তার স্নিগ্ধতা অনুভব করতে পারে।
মানুষের মন যখন সংশয়ে ভরে ওঠে, তখন সে সবচেয়ে বড় সত্যকেও মিথ্যে বলে মনে করে। বিশ্বাসের ভিত একবার নড়বড়ে হয়ে গেলে তা আবার শক্ত করে তোলা পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন কাজগুলোর একটি।
রূপের মোহ অনেকটা কুয়াশার মতো, যা রোদের আলোয় মিলিয়ে যায়। কিন্তু গুণের যে জ্যোতি মানুষের ভেতরে থাকে, তা অন্ধকার রাতেও আলোর দিশা হয়ে জ্বলে থাকে আর মানুষকে পথ দেখায় আজীবন।
ভুল মানুষকে ভালোবাসা হয়তো জীবনের একটা বড় ভুল হতে পারে, কিন্তু সেই ভুল থেকেই মানুষ জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষাটা পায়। বেদনা মানুষকে ভেতর থেকে পুড়িয়ে খাঁটি সোনায় পরিণত করে তোলে।
সংসারের প্রতিটি কাজের মাঝেই এক ধরণের সৌন্দর্য আছে যদি তা মনের মাধুরী মিশিয়ে করা যায়। কাজকে বোঝা মনে করলে জীবন অতিষ্ঠ হয়, আর কাজকে প্রার্থনা মনে করলে মন শান্তিতে ভরে ওঠে।
আমরা যাকে নিজের বলে দাবি করি, আসলে তার ওপর আমাদের কোনো চিরস্থায়ী অধিকার নেই। আমরা সবাই এই পৃথিবীতে সময়ের মেহমান, তাই যা কিছু আছে তাকে আগলে রাখার চেয়ে উপভোগ করাই শ্রেয়।
স্মৃতিরা মাঝে মাঝে খুব নিষ্ঠুর হয়। যখন আমরা সব ভুলে সামনে এগোতে চাই, তখন এক সামান্য গন্ধ বা একটি সুর আমাদের টেনে নিয়ে যায় ফেলে আসা সেই যন্ত্রণার দিনগুলোতে খুব নিভৃতে।
শান্তি মানে কেবল নীরবতা নয়, শান্তি হলো সব ঝড়ের মাঝেও স্থির থাকতে পারা। মনের ভেতরে যখন কোনো হাহাকার থাকে না এবং মানুষ নিজের ভাগ্যের ওপর বিশ্বাস রাখে, তখনই প্রকৃত শান্তি ধরা দেয়।
মানুষের চরিত্র নদীর মতো, সবসময় পরিবর্তনশীল। আজ যাকে খুব ভালো মনে হচ্ছে, কাল হয়তো তার অন্য রূপ দেখা যাবে। তাই কোনো মানুষকে নিয়ে শেষ কথা বলার আগে সময় নেওয়া খুব জরুরি।
ক্ষমা করা কেবল মহত্বের পরিচয় নয়, ক্ষমা হলো নিজের মুক্তির পথ। যে মানুষ ক্ষমা করতে পারে না, সে আসলে অতীতের সেই বিষাক্ত স্মৃতিগুলোকেই নিজের ভেতরে দিনের পর দিন লালন করে কষ্ট পায়।
স্বপ্ন যদি বাস্তব না হয় তবে দুঃখ পাওয়ার কিছু নেই। স্বপ্নের সার্থকতা হলো তা আমাদের রঙিন হতে শিখিয়েছে আর রুক্ষ পৃথিবীর মাঝেও এক চিলতে কল্পনা করার সাহস দিয়েছে আমাদের অবচেতন মনে।

