দান নিয়ে কোরআনের আয়াতগুলোতে দান বা সাদাকাহের গুরুত্ব অনেকবার উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, যারা সম্পদ আল্লাহর পথে ব্যয় করে, তাদের জন্য রয়েছে অশেষ পুরস্কার। (সুরা আল-বাকারা: ২৬৫) দান শুধু অর্থ দিতে নয়, বরং দুঃস্থদের সাহায্য, অনাথ ও অসহায়দের পাশে দাঁড়ানোও এর অন্তর্ভুক্ত।
(সুরা আল-হাদীদ: ১৮) যে ব্যক্তি নিঃস্বার্থভাবে দান করে, তার উদ্দেশ্য আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা, কেবল মানুষের প্রশংসা নয়। (সুরা আল-বাকারাহ: ২৭৫) কোরআন শিক্ষা দেয় যে, দানকারী কখনো ক্ষতিগ্রস্ত হয় না; বরং আল্লাহ তার উপকার অগণিতভাবে ফেরত দেন। দান আত্মশুদ্ধি ও সমাজে ন্যায় ও সহমর্মিতা বৃদ্ধি করে।
দান নিয়ে কোরআনের আয়াত
সূরা আল-বাকারা (২: ২৬১)
ভাবার্থ: যারা আল্লাহর পথে তাদের সম্পদ ব্যয় করে, তাদের উপমা হলো একটি শস্যবীজের মতো, যা থেকে সাতটি শীষ জন্মায়, আর প্রতিটি শীষে থাকে একশত দানা। আল্লাহ যাকে ইচ্ছা বহুগুণ বাড়িয়ে দেন। আল্লাহ প্রাচুর্যময়, সর্বজ্ঞ। (মূল বার্তা: আল্লাহর পথে দান করলে প্রতিদান বহুগুণে বৃদ্ধি পায়।)
সূরা আল-বাকারা (২: ২৬২)
ভাবার্থ: যারা আল্লাহর পথে সম্পদ ব্যয় করে, আর ব্যয় করার পর খোঁটা দেয় না বা কষ্ট দেয় না, তাদের জন্য তাদের রবের কাছে রয়েছে পুরস্কার। তাদের কোনো ভয় নেই এবং তারা চিন্তিতও হবে না। (মূল বার্তা: দানের পর খোঁটা দেওয়া থেকে বিরত থাকা আবশ্যক।)
সূরা আল-বাকারা (২: ২৭২)
ভাবার্থ: তাদের সৎপথে আনার দায়িত্ব আপনার নয়। বরং আল্লাহ যাকে ইচ্ছা সৎপথে আনয়ন করেন। আর তোমরা যে অর্থই দান করো না কেন, তা তোমাদের নিজেদের জন্যই। আর তোমরা শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে দান করে থাকো। (মূল বার্তা: দানের একমাত্র উদ্দেশ্য হওয়া উচিত আল্লাহর সন্তুষ্টি।)
সূরা আল-বাকারা (২: ২৭৪)
ভাবার্থ: যারা রাতে ও দিনে, গোপনে ও প্রকাশ্যে তাদের সম্পদ ব্যয় করে, তাদের পুরস্কার তাদের রবের কাছে রয়েছে। তাদের কোনো ভয় নেই এবং তারা চিন্তিতও হবে না। (মূল বার্তা: প্রকাশ্য ও গোপন, সব ধরনের দানই আল্লাহর কাছে গৃহীত হয়।)
সূরা আল-বাকারা (২: ২৬৭)
ভাবার্থ: হে মুমিনগণ, তোমরা তোমাদের উপার্জিত হালাল সম্পদ থেকে এবং আমি তোমাদের জন্য ভূমি থেকে যা উৎপন্ন করেছি, তা থেকে উৎকৃষ্ট অংশ আল্লাহর পথে ব্যয় করো। আর তোমরা নিকৃষ্ট বস্তুর দিকে লক্ষ্য করো না। (মূল বার্তা: দানের জন্য উত্তম ও হালাল সম্পদ নির্বাচন করা উচিত।)
সূরা আল-বাকারা (২: ২৭৭)
ভাবার্থ: নিশ্চয় যারা ঈমান আনে, সৎ কাজ করে, সালাত কায়েম করে এবং যাকাত দেয়, তাদের জন্য তাদের রবের কাছে রয়েছে পুরস্কার। তাদের কোনো ভয় নেই এবং তারা চিন্তিতও হবে না। (মূল বার্তা: ঈমান, সৎকাজ, সালাত ও যাকাত একত্রে সফলতা নিয়ে আসে।)
সূরা আল-ইমরান (৩: ১৩৪)
ভাবার্থ: (মুত্তাকি তারা) যারা সচ্ছল ও অসচ্ছল উভয় অবস্থাতেই ব্যয় করে, যারা ক্রোধ সংবরণ করে এবং মানুষকে ক্ষমা করে। আর আল্লাহ সৎকর্মশীলদের ভালোবাসেন। (মূল বার্তা: যেকোনো পরিস্থিতিতে দানশীলতা ও উদারতা বজায় রাখা মুত্তাকির বৈশিষ্ট্য।)
সূরা আত-তাওবা (৯: ৬০)
ভাবার্থ: সাদাকা তো কেবল তাদের জন্য: অভাবগ্রস্ত, মিসকিন, সাদাকা সংগ্রহকারী কর্মচারী, যাদের হৃদয় দুর্বল, দাসমুক্তিতে, ঋণগ্রস্তদের জন্য, আল্লাহর পথে এবং মুসাফিরদের জন্য। এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত। (মূল বার্তা: যাকাতের নির্দিষ্ট আটটি খাত রয়েছে।)
সূরা আত-তাওবা (৯: ১০৩)
ভাবার্থ: তাদের সম্পদ থেকে সাদাকা (যাকাত) গ্রহণ করুন। এর মাধ্যমে আপনি তাদেরকে পবিত্র করবেন এবং পরিশুদ্ধ করবেন। আর তাদের জন্য দুআ করুন। আপনার দুআ তাদের জন্য শান্তি ও স্বস্তিদায়ক। (মূল বার্তা: যাকাত বা সাদাকা সম্পদকে পবিত্র করে এবং মনকে পরিশুদ্ধ করে।)
সূরা আল-হাদীদ (৫৭: ৭)
ভাবার্থ: তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আনো এবং আমি তোমাদেরকে যা কিছুর উত্তরাধিকারী করেছি, তা থেকে ব্যয় করো। তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান আনবে ও ব্যয় করবে, তাদের জন্য রয়েছে মহা পুরস্কার। (মূল বার্তা: আল্লাহ প্রদত্ত সম্পদ থেকে ব্যয় করা ঈমানের দাবি।)
সূরা আল-হাদীদ (৫৭: ১১)
ভাবার্থ: কে সে, যে আল্লাহকে উত্তম ঋণ দিতে প্রস্তুত? আল্লাহ তাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেবেন। আর তার জন্য রয়েছে সম্মানজনক পুরস্কার। (মূল বার্তা: আল্লাহর পথে দান করাকে উত্তম ঋণ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে।)
সূরা মুনাফিকুন (৬৩: ১০)
ভাবার্থ: আর যখন তোমাদের কারো মৃত্যু উপস্থিত হবে, তার আগেই আমি তোমাদের যা রিজিক দিয়েছি তা থেকে ব্যয় করো। তখন সে বলবে, ‘হে আমার রব, আমাকে যদি আরও কিছু কালের জন্য অবকাশ দিতে, তাহলে আমি সাদাকা করতাম এবং সৎকর্মশীলদের অন্তর্ভুক্ত হতাম।’ (মূল বার্তা: মৃত্যুর আগেই দান করার গুরুত্ব এবং এর জন্য আফসোস না করার তাগিদ।)
সূরা আল-লাইল (৯২: ৫-৬)
ভাবার্থ: অতএব, কেউ দান করলে এবং তাকওয়া অবলম্বন করলে, আর যা উত্তম তা বিশ্বাস করলে, আমি তাকে সহজ পথের জন্য সহজ করে দেব। (মূল বার্তা: দান এবং তাকওয়া (খোদাভীতি) জীবনে সহজ পথ এনে দেয়।)
সূরা আল-মাউন (১০৭: ১-৩)
ভাবার্থ: আপনি কি দেখেছেন তাকে, যে দীনকে অস্বীকার করে? সে তো সেই, যে এতিমকে রূঢ়ভাবে তাড়িয়ে দেয়, আর মিসকিনকে অন্নদানে উৎসাহিত করে না। (মূল বার্তা: এতিম ও দরিদ্রদের প্রতি অবহেলা করা ধর্ম অস্বীকারের শামিল।)
সূরা আত-তাগাবুন (৬৪: ১৭)
ভাবার্থ: যদি তোমরা আল্লাহকে উত্তম ঋণ দাও, তবে তিনি তোমাদের জন্য তা বহুগুণ বাড়িয়ে দেবেন এবং তোমাদের ক্ষমা করবেন। আল্লাহ গুণগ্রাহী, সহনশীল। (মূল বার্তা: উত্তম ঋণ বা দান ক্ষমা লাভের পথও খুলে দেয়।)
সূরা আল-বাকারা (২: ২৬৩)
ভাবার্থ: মিষ্টি কথা ও ক্ষমা প্রদর্শন সেই দানের চেয়ে উত্তম, যার পরে কষ্ট দেওয়া হয়। আল্লাহ অভাবমুক্ত, সহনশীল। (মূল বার্তা: কথা ও আচরণে নম্রতা বজায় রাখা, যা কষ্টদায়ক দান থেকে উত্তম।)
সূরা আল-ইনসান (৭৬: ৮-৯)
ভাবার্থ: আর তারা (জান্নাতীরা) আল্লাহর ভালোবাসায় মিসকিন, ইয়াতিম ও বন্দীকে খাদ্য দান করে। তারা বলে, ‘কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই আমরা তোমাদের খাওয়াই; আমরা তোমাদের থেকে কোনো প্রতিদান বা কৃতজ্ঞতা চাই না।’ (মূল বার্তা: নিঃস্বার্থভাবে শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য দান করা।)
সূরা আশ-শূরা (৪২: ৩০)
ভাবার্থ: আর তোমাদের উপর যে বিপদ আসে, তা তোমাদের হাতের কামাইয়ের ফল। আর তিনি অনেক কিছু ক্ষমা করে দেন। (মূল বার্তা: দান ও ক্ষমা পাপ মোচনে সহায়ক।)
সূরা আল-আ’রাফ (৭: ১৯৫)
ভাবার্থ: তোমরা আল্লাহকে উত্তম ঋণ দাও, যাতে তোমরা মুক্তি পেতে পারো। (মূল বার্তা: জান্নাতে মুক্তির জন্য আল্লাহর পথে ব্যয় করা।)
সূরা আল-ফজর (৮৯: ১৭-১৮)
ভাবার্থ: কখনোই না! বরং তোমরা তো এতিমকে সম্মান করো না, আর মিসকিনকে অন্নদানে উৎসাহিত করো না। (মূল বার্তা: এতিম ও দরিদ্রদের প্রতি দায়িত্ব পালন না করা নিন্দনীয় কাজ।)

