দুর্জন বিদ্বান হলেও পরিত্যাজ্য প্রবাদটির মূল ভাব হলো যে, যতই কেউ জ্ঞানী বা শিক্ষিত হোক না কেন, যদি তার চরিত্র দুষ্কৃতকারী বা কুপ্রকৃতির হয়, সে বিশ্বাসযোগ্য বা অনুসরণের যোগ্য নয়। বিদ্যা থাকলেও যদি নৈতিকতা, সততা ও সৎ চরিত্র না থাকে, তাহলে তার জ্ঞান সমাজ বা ব্যক্তির কল্যাণে কাজে আসে না। তাই চরিত্রকে জ্ঞানচর্চার চেয়ে বেশি মূল্য দেওয়া উচিত।
দুর্জন বিদ্বান হলেও পরিত্যাজ্য ভাবসম্প্রসারণ

মূলভাব
মানুষের প্রকৃত মূল্য কেবল তার পাণ্ডিত্য বা জ্ঞানের ওপর নির্ভর করে না, বরং নির্ভর করে তার চরিত্র, নৈতিকতা এবং আচরণের ওপর। যে ব্যক্তি বিদ্বান হয়েও অসৎ, দুষ্টু বা খারাপ প্রকৃতির (দুর্জন), তার জ্ঞান সমাজের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। তাই বিদ্বান হলেও খারাপ স্বভাবের মানুষকে সর্বদাই বর্জন করা উচিত।
সম্প্রসারিত ভাব
জ্ঞান বা বিদ্যা মানুষের জীবনের শ্রেষ্ঠ সম্পদগুলির মধ্যে অন্যতম। জ্ঞান মানুষের চোখ খুলে দেয়, তাকে সঠিক পথে চলার দিশা দেখায় এবং সমাজকে উন্নতির শিখরে পৌঁছে দিতে সাহায্য করে। একজন বিদ্বান বা জ্ঞানী ব্যক্তি সমাজে বিশেষ সম্মান লাভ করেন, কারণ তাঁর কাছ থেকে মানুষ নতুন কিছু শিখতে পারে এবং উপকৃত হয়।
তবে, কেবল জ্ঞান থাকলেই একজন ব্যক্তি সর্বজনীনভাবে গ্রহণযোগ্য হন না। মানুষের নৈতিক চরিত্র, মানসিকতা এবং ব্যবহারের ওপর তার সামাজিক মূল্য নির্ধারিত হয়। যখন একজন ব্যক্তি অনেক জ্ঞান অর্জন করেও সেই জ্ঞানকে মানবকল্যাণে বা সৎ পথে ব্যবহার না করে, বরং নিজ স্বার্থসিদ্ধির জন্য বা অন্যের ক্ষতি করার জন্য ব্যবহার করে, তখন তার সেই জ্ঞান সমাজের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়ায়।
দুর্জন ব্যক্তিরা স্বভাবগতভাবে ঈর্ষাপরায়ণ, অহংকারী, স্বার্থান্বেষী এবং ক্ষতিকর হয়। তাদের জ্ঞান তাদের কুটিল মনকে আরও শক্তিশালী করে তোলে। একজন বিদ্বান দুর্জন তার বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে খুব সহজে সাধারণ মানুষকে প্রতারিত করতে পারে, সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে পারে এবং অন্যের ক্ষতিসাধন করতে পারে। সাপের মাথায় মণি থাকলেও যেমন তার বিষাক্ততা কমে না, তেমনি দুর্জন ব্যক্তির মনে বিদ্বেষ থাকলে তার পাণ্ডিত্য তাকে ভালো মানুষ হিসেবে প্রমাণ করতে পারে না। বরং, তাদের জ্ঞান বিষধর সাপের বিষের মতোই ভয়ঙ্কর হতে পারে।
এ কারণেই শাস্ত্র ও সমাজ উভয়ই উপদেশ দেয় যে ব্যক্তি বিদ্বান হয়েও অসৎ, তার সঙ্গ ত্যাগ করা উচিত। একজন বিদ্বান ব্যক্তির কাছ থেকে যদি কেবল বিদ্বেষ, মিথ্যাচার ও অনিষ্টই লাভ হয়, তবে সেই জ্ঞানীর সান্নিধ্য বর্জন করাই বুদ্ধিমানের কাজ। কারণ, সৎসঙ্গ মানুষের জীবনকে উন্নত করে, আর অসৎসঙ্গ, তা যতই বিদ্বান হোক না কেন, মানুষের জীবনে দুর্গতি ডেকে আনে।
মন্তব্য
‘দুর্জন বিদ্বান হলেও পরিত্যাজ্য’ এই ভাবসম্প্রসারণটি একটি চিরন্তন সত্যকে তুলে ধরে। এটি আমাদের শেখায় যে, জীবনের সব ক্ষেত্রে জ্ঞানের চেয়েও চারিত্রিক গুণাবলী ও নৈতিকতা অধিক গুরুত্বপূর্ণ। আমরা যেন কেবল বাইরের মেধা বা পাণ্ডিত্য দেখে মুগ্ধ না হই, বরং মানুষের অভ্যন্তরীণ সততা ও বিবেকবোধকে মূল্য দিই। চরিত্রহীন জ্ঞানীর চেয়ে চরিত্রবান অজ্ঞ ব্যক্তি সমাজের জন্য অনেক বেশি নিরাপদ ও কল্যাণকর।

