কথায় আছে কীর্তিমানের মৃত্যু নেই মানে যার মানুষের মৃত্যু হলেও সৎ কাজ করা ব্যক্তি তার কাজের মাধ্যমে দীর্ঘদিন পর্যন্ত বেচে থাকে। মানুষ মাতৃ মরণশীল তবে মানুষ তার কাজের জন্য অনেক সময় অমর হয়ে থাকে। যেমনঃ আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম অনেক আগে মারা গেলেও আমরা তাকে ভুলিনি।
কীর্তিমানের মৃত্যু নেই ভাবসম্প্রসারণ
মূলভাব
পৃথিবীতে যারা মহৎ কাজ করে যান, মানবকল্যাণে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেন, কিংবা এমন কোনো সৃজনশীল অবদান রাখেন যা সমাজ ও সভ্যতার জন্য অপরিহার্য, তাঁদের নশ্বর দেহ পঞ্চভূতে বিলীন হলেও তাঁরা কর্মের মাধ্যমে অমরত্ব লাভ করেন। তাঁদের শারীরিক মৃত্যু হলেও কর্ম ও আদর্শের মধ্য দিয়ে তাঁরা মানুষের হৃদয়ে চিরজীবী থাকেন।
সম্প্রসারিত ভাব
মানুষের জীবন ক্ষণস্থায়ী। জন্ম নিলে একদিন মৃত্যু অবধারিত। এই পৃথিবীতে কেউই চিরকাল বেঁচে থাকতে পারে না। কিন্তু মানুষ শুধুমাত্র তার দেহের পরিচয়ে বেঁচে থাকে না। প্রতিটি মানুষের জীবনের আসল উদ্দেশ্য হলো নিজের কর্ম, চিন্তা এবং অবদানের মধ্য দিয়ে এক দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব রেখে যাওয়া।
যাঁরা কীর্তিমান, অর্থাৎ যাঁরা তাঁদের জীবনকালে এমন কোনো মহৎ কাজ বা সৃষ্টি রেখে যান যা মানবজাতির কল্যাণ সাধন করে, তাঁরাই এই পৃথিবীতে অমরত্ব লাভ করেন। এই অমরত্ব শারীরিক নয়, বরং কর্মের অমরত্ব। একজন বিজ্ঞানী তাঁর আবিষ্কারের মাধ্যমে, একজন শিল্পী তাঁর শিল্পের মাধ্যমে, একজন সাহিত্যিক তাঁর অমর সৃষ্টির মাধ্যমে, অথবা একজন সমাজ সংস্কারক তাঁর আদর্শ ও ত্যাগের মাধ্যমে যুগ যুগ ধরে মানুষের অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকেন। তাঁদের আদর্শ ও শিক্ষা কখনোই বিলীন হয় না; বরং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে তা প্রেরণা জুগিয়ে চলে।
উদাহরণস্বরূপ, বিজ্ঞানীরা যখন কোনো জীবন রক্ষাকারী ওষুধ বা প্রযুক্তি আবিষ্কার করেন, তখন সেই আবিষ্কারের সুবিধা অনন্তকাল ধরে মানুষ উপভোগ করে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বা কাজী নজরুল ইসলামের মতো সাহিত্যিকদের সৃষ্টি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ভিত্তি মজবুত করে রেখেছে। তাঁদের দেহ নেই, কিন্তু তাঁদের কবিতা, গান, উপন্যাস কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ে আজও জীবন্ত। একজন সাধারণ মানুষ হয়তো তাঁদের নাম জানত না, কিন্তু তাঁদের সৃষ্টিকর্মের উপকারিতা ভোগ করে চলেছে।
অন্যদিকে, এমন অনেক মানুষ আছেন যাঁরা শুধু নিজেদের ভোগ-বিলাসের জন্য জীবন অতিবাহিত করেন। তাঁদের জীবন ব্যক্তিগত সুখ-দুঃখের বাইরে সমাজে কোনো গভীর ছাপ ফেলে না। মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গেই তাঁদের জীবনের সব আলোচনা থেমে যায়, তাঁরা দ্রুত বিস্মৃতির আড়ালে চলে যান।
তাই, একজন মানুষের জীবনের সার্থকতা নির্ভর করে সে কত দীর্ঘ সময় বাঁচল তার ওপর নয়, বরং সে কত মহৎ কাজ করল এবং মানুষের কল্যাণে কী অবদান রাখল তার ওপর। মানুষ তার কর্মের ফলেই স্মরণীয় হয়। কীর্তিমানেরা মৃত্যুর মাধ্যমে দেহের সীমা অতিক্রম করে সময়ের গণ্ডি পেরিয়ে চিরন্তন হয়ে ওঠেন। তাঁদের রেখে যাওয়া আদর্শই ভবিষ্যতের প্রজন্মকে সঠিক পথে চালিত করে।
মন্তব্য
কীর্তিমানের মৃত্যু নেই’ এই প্রবাদ বাক্যটি মানব জীবনকে উদ্দেশ্যমুখী করে তোলার এক শাশ্বত আহ্বান। এটি শেখায় যে, জীবনের লক্ষ্য কেবল ব্যক্তিগত প্রাপ্তি বা ভোগ নয়; বরং মানবকল্যাণ ও সৃষ্টিশীলতার মাধ্যমে নিজেকে সমাজের জন্য অপরিহার্য করে তোলা। শারীরিক বিনাশ হলেও কর্মের মহিমা মানুষকে অমরত্ব দান করে। তাই আমাদের উচিত, কীর্তিমানদের আদর্শ অনুসরণ করে এমন কাজ করা, যা আমাদের মৃত্যুর পরেও পৃথিবীতে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলে এবং মানুষকে আলোর পথে এগিয়ে নিয়ে যায়।

