সোনার তরী কবিতার সৃজনশীল প্রশ্ন ও উত্তর পাবে আজকের এই পোস্ট হতে, তোমাদের যেকোনো বিষয়ে সাজেশন লাগলে কমেন্টে জানাতে ভুলবে না। এই কবিতায় দেখা যায়, মাঝি তার সমস্ত ফসল নৌকায় তুলে নিলেও, কৃষককে নৌকায় জায়গা দিতে পারে না, কারণ ‘ঠাঁই নাই, ঠাঁই নাই ছোটো সে তরী, আমারি সোনার ধানে গিয়েছে ভরি।’
এই দৃশ্যের মধ্য দিয়ে কবি বোঝাতে চেয়েছেন: মহাকাল বা সময় শুধু মানুষের কর্মফল বা সৃষ্টিকেই বহন করে নিয়ে যায়। মানুষ তার কাজ দিয়ে অমর হতে পারে, কিন্তু সেই কাজের স্রষ্টা হিসেবে ব্যক্তিমানুষের জীবনে কোনো স্থান হয় না। জীবন শেষে মানুষ কালের স্রোতে একা পড়ে থাকে, কেবল তার ‘সোনার ধান’ বা মহৎ সৃষ্টিই অমরতা লাভ করে।
সোনার তরী কবিতার সৃজনশীল প্রশ্ন ও উত্তর
সৃজনশীল-১ঃ রবীন্দ্রনাথের ‘মৃত্যুভাবনা’ জীবনের আরেক নাম। জন্মজন্মান্তরের যাত্রাপথে পরমাত্মীয়ের মতো নতুন নতুন জীবনপর অনুসন্ধান দান করে সে। মরণ কখনো তাই মহাকালের মিলনদৃত। কবির মানস সরোবরে অনুভূতির বর্ণচ্ছটায় রহস্যময় আবরণ বিশেষকে ছাড়িয়ে হয়ে উঠেছে নির্বিশেষ। আবার পরক্ষণেই নির্বিশেষ থেকে বিশেষের স্তরে নেমে এসে ব্যক্তিসত্তা নিয়ে উপস্থিত হতে প্রণয়িনী রাধিকার শ্যামকৃষ্ণ হয়ে। পাশ্চাত্যের লেখকদের সঙ্গে ভাবনার মিল থাকা সত্ত্বেও অন্যসব ক্ষেত্রে যেমন, তেমনি মৃত্যুভাবনার ক্ষেত্রেও বিশ্বকবির মৃত্যুচেতনা একান্তভাবে একক।
ক. শূন্য নদীর তীরে কে পড়ে রইল?
খ. “বাঁকা জল’ বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
গ. উদ্দীপকে ‘সোনার তরী’ কবিতার কোন দিকটি ফুটে উঠেছে? তুলে ধরো।
ঘ. মৃত্যু নিয়ে উদ্দীপকের সঙ্গে ‘সোনার তরী’ কবিতার দৃষ্টিভঙ্গিগত পার্থক্য বিশ্লেষণ করো।
ক. শূন্য নদীর তীরে কে পড়ে রইল?
‘সোনার তরী’ কবিতা অনুসারে, প্রবল বর্ষার দিনে ধান কাটা শেষ হওয়ার পর শূন্য নদীর তীরে কৃষক (বা ব্যক্তি-কবি) একা পড়ে রইল।
খ. “বাঁকা জল’ বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
‘বাঁকা জল’ বলতে ভরা বর্ষায় নদীর জলের ভয়ংকর রূপ ধারণের বিষয়টিকে বোঝানো হয়েছে। কবিতায় এক নিঃসঙ্গ কৃষক সোনার ধান কেটে নদীতীরবর্তী খেতে অপেক্ষমাণ। আকাশে ঘন মেঘের গর্জন, বর্ষার ভরা নদীর ক্ষুরধারা স্রোতের সাথে এর জলও বাঁকা হয়ে খেলা করছে। ছোটো খেতটুকুকে ধীরে ধীরে গ্রাস করে চলেছে তা। এভাবে ‘বাঁকা জল’ শব্দবন্ধের ভেতর দিয়ে কবিতাটিতে বৈরী প্রকৃতির রুদ্ররূপের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। এছাড়া ‘বাঁকা জল’ কবিতাটিতে অনন্ত কালস্রোতের প্রতীক।
গ. উদ্দীপকে ‘সোনার তরী’ কবিতার কোন দিকটি ফুটে উঠেছে? তুলে ধরো।
উদ্দীপকে রবীন্দ্রনাথের ‘মৃত্যুভাবনা’ এবং ‘মহাকাল’ বা চিরন্তন সময়কে কেন্দ্র করে যে দার্শনিক ধারণাটি প্রকাশ পেয়েছে, ‘সোনার তরী’ কবিতায় সেই একই মহাকালের ধারণা এবং ব্যক্তিমানুষ ও তার কর্মের অমরত্ব এই দিকটি ফুটে উঠেছে।
উদ্দীপকে বলা হয়েছে, মরণ হলো ‘মহাকালের মিলনদূত’ এবং জন্মজন্মান্তরের যাত্রাপথে এটি নতুন নতুন জীবনের সন্ধান দেয়। ‘সোনার তরী’ কবিতায় যে মাঝি তরী বেয়ে আসে, সেও সেই মহাকাল-এর প্রতীক। এই মাঝি মানুষের নশ্বর জীবনের সমস্ত সৃষ্টি (সোনার ধান) বহন করে নিয়ে যায়, যা কালের যাত্রাপথে অমরতা লাভ করে। এই বিচারে, মহাকালের স্রোতে ব্যক্তিজীবনের বিনাশ হলেও তার শ্রেষ্ঠ কর্মগুলি কালের হাতে রক্ষা পায়—এই মূল দিকটিই উদ্দীপকের ভাবনার সঙ্গে সম্পর্কিত।
ঘ. মৃত্যু নিয়ে উদ্দীপকের সঙ্গে ‘সোনার তরী’ কবিতার দৃষ্টিভঙ্গিগত পার্থক্য বিশ্লেষণ করো।
মৃত্যু বা মহাকাল সম্পর্কে উদ্দীপক ও ‘সোনার তরী’ কবিতার দৃষ্টিভঙ্গিতে একটি মৌলিক পার্থক্য বিদ্যমান।
উদ্দীপকের দৃষ্টিভঙ্গি (মিলন ও ধারাবাহিকতা): উদ্দীপক অনুসারে, মৃত্যু হলো জীবনের আরেকটি নাম, যা ‘পরমাত্মীয়ের মতো’ নতুন জীবনের সন্ধান দেয়। এখানে মৃত্যুচেতনা মূলত মিস্টিক্যাল ও পজিটিভ। এটি নশ্বর ব্যক্তিকে ‘নির্বিশেষ’ সত্তার সঙ্গে মিলিয়ে দেয় এবং মহাকালের সঙ্গে মিলন ঘটিয়ে দেয়। এই দর্শনে, মৃত্যু একটি ট্র্যাজেডি নয়, বরং এক ধারাবাহিক যাত্রাপথের ইতিবাচক অংশ।
‘সোনার তরী’ কবিতায় মৃত্যু বা মহাকালকে এক নিষ্ঠুর, নৈর্ব্যক্তিক শক্তি হিসেবে দেখানো হয়েছে। মহাকাল (মাঝি) কেবল নশ্বর কর্মফল (সোনার ধান)টুকুকে গ্রহণ করে অমরত্ব দান করে। কিন্তু ব্যক্তি স্রষ্টাকে (কৃষককে) সেই নৌকায় স্থান দেয় না। শেষ পঙক্তি “শূন্য নদীর তীরে রহিনু পড়ি’, যাহা ছিল নিয়ে গেল সোনার তরী” এই বিচ্ছেদের এক গভীর বিষাদ ও একাকীত্বের অনুভূতি প্রকাশ করে। এখানে মহাকালের সঙ্গে ব্যক্তিমানুষের মিলন ঘটানোর পরিবর্তে তার বিচ্ছেদ ও বর্জন দেখানো হয়েছে।
মূল পার্থক্য:
উদ্দীপক: মৃত্যু হলো মিলনদূত (মৃত্যু একটি সার্থক পরিণতি)।
সোনার তরী: মৃত্যু/মহাকাল কেবল কর্মফলকে গ্রহণ করে, কিন্তু স্রষ্টাকে বর্জন করে (মৃত্যু ব্যক্তিজীবনের জন্য বিয়োগান্তক)।
উদ্দীপকে মৃত্যুতে ‘আত্মার মুক্তি ও মহাকালের সঙ্গে মিলন’-এর শান্তি খোঁজা হয়েছে, আর কবিতায় ‘নশ্বর মানুষের জীবনের চূড়ান্ত ব্যর্থতা ও একাকীত্ব’-এর বেদনা প্রকাশ পেয়েছে।
সৃজনশীল-২ঃ শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতায় ভারতীয় ভাববাদী দর্শন অবলীলায় জায়গা করে নিয়েছে। তিনি মৃত্যুচিন্তায় ডুবে যেতে যেতে কিছু একটা আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চান। কিন্তু আধুনিক বিশ্বে মানুষ বৈজ্ঞানিক চিন্তাকে কাজে লাগিয়ে মৃত্যুর সামনে বাঁধ দেওয়ার শত চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছেন। বিজ্ঞান মেনে নিয়েছে মৃত্যু অনিবার্য এবং অবশ্যম্ভাবী সত্য। মৃত্যুকে প্রতিরোধের কোনো উপায় নেই।
ক. মহাকালের চিরন্তন স্রোতে কী টিকে থাকে?
খ. কবিতায় ‘একখানি ছোটো খেত’ বলতে কী বোঝানো হয়েছে? ব্যাখ্যা করো।
গ. উদ্দীপকের সঙ্গে ‘সোনার তরী’ কবিতার সাদৃশ্য ব্যাখ্যা করো।
ঘ. উদ্দীপকে বর্ণিত মৃত্যুচেতনার দিকটি ‘সোনার তরী’ কবিতার আলোকে বিশ্লেষণ করো।
ক. মহাকালের চিরন্তন স্রোতে কী টিকে থাকে?
মহাকালের চিরন্তন স্রোতে মানুষের সৃষ্টিকর্ম, মহৎ কাজ বা শিল্প টিকে থাকে।
খ. কবিতায় ‘একখানি ছোটো খেত’ বলতে কী বোঝানো হয়েছে? ব্যাখ্যা করো।
‘সোনার তরী’ কবিতায় ‘একখানি ছোটো খেত’ বলতে মানুষের এই নশ্বর জীবনকাল বা ব্যক্তি মানুষের সীমাবদ্ধ জীবনক্ষেত্র-কে বোঝানো হয়েছে।
খেত হলো ফসল উৎপাদনের স্থান। এই খেতটি ছোট, যা ইঙ্গিত করে যে মানুষের জীবনকাল বা তার কর্মক্ষেত্র খুবই সীমিত ও ক্ষণস্থায়ী। কৃষক যেমন এই ছোট খেতের সীমানার মধ্যে ফসল ফলায়, তেমনি মানুষও তার ক্ষণস্থায়ী জীবনে বিভিন্ন কাজ বা সৃষ্টিশীল কর্মের জন্ম দেয়। জীবনের শেষ পর্যায়ে এসে এই ‘ছোট খেত’ অর্থাৎ নশ্বর জীবনকালটিকেই সে পার হয়ে যেতে চায়। প্রবল বর্ষা এবং স্রোত যেমন খেতটিকে প্লাবিত করার উপক্রম করে, তেমনি জীবনের শেষ মুহূর্তের বিপদ বা মৃত্যুভীতি মানুষকে গ্রাস করে। এই প্রতীকটি মানুষের জীবনের সীমাবদ্ধতা ও অসহায়ত্ব ফুটিয়ে তুলেছে।
গ. উদ্দীপকের সঙ্গে ‘সোনার তরী’ কবিতার সাদৃশ্য ব্যাখ্যা করো।
উদ্দীপক এবং ‘সোনার তরী’ কবিতার মধ্যে প্রধান সাদৃশ্য হলো মৃত্যুচেতনা এবং মহাকালের ধারণা।
উদ্দীপকে বলা হয়েছে, “মৃত্যু অনিবার্য এবং অবশ্যম্ভাবী সত্য” এবং বৈজ্ঞানিক চিন্তাও মৃত্যুর সামনে বাঁধ দিতে ব্যর্থ। ‘সোনার তরী’ কবিতাতেও কৃষক তার নশ্বর দেহ নিয়ে মহাকালের স্রোতে একা পড়ে থাকে, যা মৃত্যুর কাছে জীবনের এই অসহায় আত্মসমর্পণ-কেই তুলে ধরে।
উদ্দীপকটিতে ভারতীয় ভাববাদী দর্শনের কথা বলা হয়েছে, যেখানে মৃত্যুচিন্তা এক গভীর উপলব্ধির জন্ম দেয়। ‘সোনার তরী’ কবিতায় ‘সোনার তরী’ ও তার ‘মাঝি’ হলো সেই মহাকাল বা চিরন্তন সময়, যার কাজ হলো জীবন থেকে কেবল শ্রেষ্ঠ ফসল (সৃষ্টিকর্ম)টুকুকে গ্রহণ করা এবং তাকে অমরত্ব দান করা। উভয় ক্ষেত্রেই মহাকালকে একটি অলঙ্ঘনীয় ও শক্তিশালী অস্তিত্ব হিসেবে স্বীকার করা হয়েছে, যা মানবজীবনের সমাপ্তি ও তার কাজের টিকে থাকার প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করে।
ঘ. উদ্দীপকে বর্ণিত মৃত্যুচেতনার দিকটি ‘সোনার তরী’ কবিতার আলোকে বিশ্লেষণ করো।
উদ্দীপকে মৃত্যুচেতনার যে দিকটি বর্ণিত হয়েছে, তা হলো: মৃত্যু অনিবার্য হলেও মানুষ কিছু একটা আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চায়। ‘সোনার তরী’ কবিতা এই ভাবনাটির একটি দার্শনিক পরিণতি বিশ্লেষণ করে।
বাঁচার আকাঙ্ক্ষা ও সৃষ্টিকর্ম: উদ্দীপকে যেমন বলা হয়েছে, মানুষ মৃত্যুর সামনে বাঁধ দিতে চায় এবং “কিছু একটা আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চায়”, ‘সোনার তরী’ কবিতায় কৃষকের সমস্ত ‘সোনার ধান’ হলো সেই ‘কিছু একটা’ যা জীবন শেষে আঁকড়ে ধরার বা বাঁচিয়ে রাখার শেষ চেষ্টা। এই ধান বা সৃষ্টিকর্মের মাধ্যমেই মানুষ অমর হতে চায়।
উদ্দীপকের আকাঙ্ক্ষার বিপরীতে, ‘সোনার তরী’ কবিতা দেখায় যে মহাকাল (মাঝি) কেবল মানুষের সৃষ্টি বা কর্মের ফসলটুকুকে গ্রহণ করে তাকে অমরতা দান করে। কিন্তু যে মানুষটি বাঁচতে চেয়েছিল, সেই স্রষ্টা বা ব্যক্তিকে (কৃষক) মহাকাল পরিত্যাগ করে। মাঝি কৃষককে সাফ জানিয়ে দেয়: “ঠাঁই নাই, ঠাঁই নাই ছোটো সে তরী, আমারি সোনার ধানে গিয়েছে ভরি।”
এই চূড়ান্ত বিচ্ছেদের মাধ্যমেই ‘সোনার তরী’ কবিতা উদ্দীপকে বর্ণিত অনিবার্য মৃত্যুচেতনাকে সম্পূর্ণতা দেয়। এটি দেখায় যে বৈজ্ঞানিক বা অন্য যেকোনো প্রচেষ্টাই হোক না কেন, ব্যক্তিগত মৃত্যু অনিবার্য। মানুষ তার নশ্বর সত্তা দিয়ে মহাকালকে জয় করতে পারে না, কেবল তার কর্মের ফসল দিয়েই সে জগতে টিকে থাকে।
সুতরাং, উদ্দীপকের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী মানুষ বাঁচতে চায়, আর ‘সোনার তরী’ কবিতা সেই আকাঙ্ক্ষার বাস্তবতা তুলে ধরে যে, ব্যক্তিমানুষ নয়—কেবল তার শ্রেষ্ঠ সৃষ্টিটুকুই মহাকালের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়।

