যোনিতে চুলকানি হলে ঘরোয়া উপায় সাময়িক আরাম দিতে পারে, তবে সতর্কতা জরুরি। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ; প্রতিদিন পরিষ্কার পানি দিয়ে আলতোভাবে ধোয়া ভালো। ঢিলা ও সুতি কাপড় ব্যবহার করলে বাতাস চলাচল সহজ হয় এবং ঘাম কমে। অতিরিক্ত সুগন্ধযুক্ত সাবান বা কেমিক্যাল ব্যবহার এড়ানো উচিত। দইয়ে থাকা প্রোবায়োটিক উপকারী জীবাণু বজায় রাখতে সাহায্য করতে পারে। পর্যাপ্ত পানি পান ও স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়াও সহায়ক। তবে চুলকানি দীর্ঘস্থায়ী হলে, ব্যথা বা স্রাব হলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
যোনিতে চুলকানি হলে ঘরোয়া উপায়
যোনিতে চুলকানি বা ইচিং একটি অস্বস্তিকর সমস্যা। অনেক সময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার অভাব বা ছত্রাক সংক্রমণের কারণে এমনটা হয়। ঘরোয়া কিছু সহজ উপায়ে আপনি প্রাথমিক স্বস্তি পেতে পারেন। নিচে ১০টি কার্যকর টিপস দেওয়া হলো:
১. আপেল সিডার ভিনেগার
আপেল সিডার ভিনেগার তার শক্তিশালী অ্যান্টি-ফাঙ্গাল এবং অ্যান্টি-ব্যাকটেরিয়াল গুণের জন্য পরিচিত। যোনির প্রাকৃতিক পিএইচ (pH) ভারসাম্য যখন নষ্ট হয়, তখনই ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া জন্মানোর সুযোগ পায়। ভিনেগার এই ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে।
ব্যবহার পদ্ধতি: দুই টেবিল চামচ খাঁটি আপেল সিডার ভিনেগার এক গ্লাস কুসুম গরম পানিতে মিশিয়ে নিন। এই মিশ্রণটি দিয়ে প্রতিদিন অন্তত দুবার আক্রান্ত স্থান পরিষ্কার করুন। চাইলে গোসলের পানিতেও ভিনেগার মিশিয়ে ব্যবহার করা যায়। এটি চুলকানি সৃষ্টিকারী ছত্রাক ধ্বংস করতে অত্যন্ত কার্যকর।
২. টক দই ও প্রোবায়োটিকস
টক দইয়ে থাকে ‘ল্যাকটোব্যাসিলাস’ নামক উপকারী ব্যাকটেরিয়া, যা যোনিপথের সুস্থ পরিবেশ ধরে রাখতে অপরিহার্য। যখন শরীরে খারাপ ব্যাকটেরিয়া বা ইস্ট বেড়ে যায়, তখন টক দই সেগুলো দমনে সাহায্য করে।
ব্যবহার পদ্ধতি: প্রতিদিন অন্তত এক কাপ চিনিমুক্ত টক দই খাওয়ার অভ্যাস করুন। এছাড়া বাহ্যিক ব্যবহারের জন্য একটি পরিষ্কার তুলার প্যাড টক দইয়ে ভিজিয়ে আক্রান্ত স্থানে ২০ থেকে ৩০ মিনিট লাগিয়ে রাখুন। এরপর হালকা গরম পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলুন। এটি সরাসরি সংক্রমণের ওপর কাজ করে দ্রুত আরাম দেয়।
৩. নারকেল তেল
নারকেল তেলে রয়েছে লরিক এসিড এবং অ্যান্টি-মাইক্রোবিয়াল উপাদান, যা ত্বকের প্রদাহ কমাতে সাহায্য করে। অনেক সময় যোনিপথ অতিরিক্ত শুষ্ক হয়ে গেলে চুলকানি শুরু হয়, নারকেল তেল এই শুষ্কতা দূর করে।
ব্যবহার পদ্ধতি: পরিষ্কার সুতি কাপড় বা তুলা ব্যবহার করে খাঁটি নারকেল তেল আক্রান্ত স্থানে হালকা করে মাখুন। খেয়াল রাখবেন যেন তেলটি কেমিক্যালমুক্ত বা অর্গানিক হয়। দিনে দুবার এটি ব্যবহারে ত্বকের জ্বালাপোড়া ও চুলকানি উল্লেখযোগ্য হারে কমে যায়।
৪. লবণ পানির সেঁক
লবণ প্রাকৃতিকভাবেই ব্যাকটেরিয়া নাশক। এটি যোনিপথের চুলকানি এবং ফোলাভাব কমাতে দারুণ কার্যকর। বিশেষ করে যোনিপথে অস্বস্তি হলে সিটজ বাথ নেওয়া সবচেয়ে সহজ সমাধান।
ব্যবহার পদ্ধতি: একটি বড় গামলা বা টাবে হালকা গরম পানি নিন এবং তাতে আধাকাপ লবণ মেশান। এবার সেই পানিতে ১০ থেকে ১৫ মিনিট বসে থাকুন। এটি যোনিপথের ভেতরে থাকা জীবাণুগুলোকে মেরে ফেলে এবং ত্বকের অস্বস্তি কমিয়ে দেয়। ঘুমানোর আগে এটি করলে রাতে ভালো ঘুম হয়।
৫. নিম পাতার প্রাকৃতিক চিকিৎসা
ভেষজ চিকিৎসায় নিম পাতাকে অ্যান্টিসেপটিকের ভাণ্ডার বলা হয়। এটি যেকোনো ধরণের চর্মরোগ ও ছত্রাক সংক্রমণে জাদুর মতো কাজ করে।
ব্যবহার পদ্ধতি: এক মুঠো নিম পাতা চার কাপ পানিতে দিয়ে ভালোভাবে ফুটিয়ে নিন। পানি ফুটে অর্ধেক হয়ে গেলে এবং রঙ বদলে গেলে চুলা থেকে নামিয়ে ঠাণ্ডা হতে দিন। এই পানি দিয়ে দিনে কয়েকবার যোনিপথ ধুয়ে নিন। এটি চুলকানি কমানোর পাশাপাশি সংক্রমণ যাতে আর না ছড়ায় তা নিশ্চিত করে।
৬. রসুন
রসুনে থাকা ‘অ্যালিসিন’ উপাদানটি শক্তিশালী অ্যান্টি-বায়োটিক হিসেবে কাজ করে। এটি শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়িয়ে ভেতরের ইনফেকশন দূর করতে সাহায্য করে।
ব্যবহার পদ্ধতি: যোনিতে চুলকানি হলে প্রতিদিন সকালে খালি পেটে এক বা দুই কোয়া কাঁচা রসুন চিবিয়ে খান। যদি চিবিয়ে খেতে সমস্যা হয়, তবে ছোট ছোট টুকরো করে গিলে পানি দিয়ে খেয়ে ফেলুন। রসুনের রস সরাসরি সংবেদনশীল স্থানে ব্যবহার না করাই ভালো, কারণ এটি জ্বালাপোড়া সৃষ্টি করতে পারে।
৭. অ্যালোভেরা জেল (ঘৃতকুমারী)
অ্যালোভেরা জেল ত্বকের শীতলতা প্রদান করে এবং র্যাশ বা জ্বালাপোড়া কমায়। এতে থাকা এনজাইম সংক্রমণের ঝুঁকি কমায় এবং ত্বককে আরাম দেয়।
ব্যবহার পদ্ধতি: তাজা অ্যালোভেরা পাতা থেকে জেল বের করে নিন। এবার এই জেলটি চুলকানিযুক্ত স্থানে লাগিয়ে ২০ মিনিট অপেক্ষা করুন। এরপর ঠাণ্ডা পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলুন। দিনে অন্তত দুবার এটি ব্যবহার করলে চুলকানির তীব্রতা কমে যাবে।
৮. টি ট্রি অয়েল
টি ট্রি অয়েল ছত্রাক ও ব্যাকটেরিয়া দমনে অত্যন্ত শক্তিশালী। তবে এটি খুব কড়া হওয়ায় সরাসরি ব্যবহার করা ঠিক নয়।
ব্যবহার পদ্ধতি: কয়েক ফোঁটা টি ট্রি অয়েল এক চামচ নারকেল তেল বা অলিভ অয়েলের সাথে মিশিয়ে নিন। এরপর মিশ্রণটি আক্রান্ত স্থানে আলতো করে লাগান। এটি ছত্রাকের কোষ প্রাচীর নষ্ট করে দেয়, ফলে সংক্রমণ আর বাড়তে পারে না। যারা দীর্ঘদিনের ইস্ট ইনফেকশনে ভুগছেন, তাদের জন্য এটি বেশ কার্যকর।
৯. সঠিক অন্তর্বাস ও পরিচ্ছন্নতা
চুলকানি হওয়ার একটি প্রধান কারণ হলো স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ। সিন্থেটিক বা নাইলনের কাপড় বাতাস চলাচলে বাধা দেয়, ফলে ঘাম জমে ব্যাকটেরিয়া জন্মায়।
ব্যবহার পদ্ধতি: সবসময় শতভাগ সুতির তৈরি অন্তর্বাস পরার চেষ্টা করুন। রাতে ঘুমানোর সময় ঢিলেঢালা পোশাক পরুন যাতে শরীরে পর্যাপ্ত বাতাস চলাচল করতে পারে। এছাড়া প্রতিবার বাথরুম ব্যবহারের পর সামনের দিক থেকে পেছনের দিকে (Front to Back) পরিষ্কার করার অভ্যাস করুন, যাতে মলদ্বারের ব্যাকটেরিয়া যোনিপথে না আসতে পারে।
১০. প্রচুর পানি পান ও খাদ্যাভ্যাস
শরীরের অভ্যন্তরীণ স্বাস্থ্য ভালো থাকলে বাইরের সমস্যা দ্রুত সেরে যায়। পর্যাপ্ত পানি পান করলে প্রস্রাব পাতলা হয় এবং মূত্রনালীর মাধ্যমে অনেক ব্যাকটেরিয়া শরীর থেকে বেরিয়ে যায়।
ব্যবহার পদ্ধতি: দিনে অন্তত ৩-৪ লিটার পানি পান করুন। পাশাপাশি ভিটামিন-সি সমৃদ্ধ ফল (যেমন- লেবু, আমলকী) বেশি করে খান। অতিরিক্ত চিনিযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলুন, কারণ চিনি ছত্রাক বা ইস্টের বংশবৃদ্ধিতে সহায়তা করে।
সতর্কতা: যদি এই যোনিতে চুলকানি দূর করার উপায়ে ৩-৪ দিনের মধ্যে উন্নতি না হয়, তবে অবশ্যই একজন চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। অতিরিক্ত চুলকানি বা দুর্গন্ধযুক্ত স্রাব কোনো বড় সমস্যার লক্ষণ হতে পারে।

