বিদ্রোহী কবিতা: বিদ্রোহী কবিতার মূলভাব সহজে বুঝতে পারবে

বিদ্রোহী কবিতার মূলভাব সহজে বুঝতে আমাদের এই পোস্ট পড়তে হবে। কবিতাটিতে নজরুল নিজেকে সমস্ত ধ্বংসাত্মক ও সৃষ্টিশীল শক্তির সমন্বয় হিসেবে তুলে ধরেছেন। তিনি একাধারে ঈশান, অনল, নটরাজ, সাইক্লোন এবং একই সাথে পরম সুন্দর ও চির-কল্যাণকর। কবির এই বিদ্রোহ সমাজের অন্যায়, শোষণ, কুসংস্কার এবং ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে।

তিনি অত্যাচারীর বিরুদ্ধে প্রতিবাদী বীর এবং শোষিত, বঞ্চিত মানুষের মমতার আশ্রয়। এই কবিতা শক্তি, সাহস এবং মানবতার জয়গান গেয়ে স্বাধীনতা ও সাম্য প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করে, যা নজরুলকে ‘বিদ্রোহী কবি’র অমর খ্যাতি এনে দিয়েছে।

বিদ্রোহী কবিতার মূলভাব

বিদ্রোহী’ কবিতাটি মূলত আত্ম-মহিমা ও আত্মশক্তির উদ্বোধনের কবিতা। কবি এখানে ‘আমি’ শব্দটিকে একটি প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করেছেন এই ‘আমি’ কোনো ব্যক্তি নজরুল নন, বরং এটি হলো মানুষের ভেতরের সেই অদম্য শক্তি, যা সব বাধা ভেঙে সামনে এগিয়ে যেতে পারে।

১. সর্বব্যাপী ‘আমি’-এর প্রকাশ: কবিতার শুরুতেই এই ‘আমি’ অত্যন্ত দৃপ্ত কণ্ঠে নিজেকে ঘোষণা করেছে “বল বীর, বল উন্নত মম শির!”। এই ‘আমি’ কখনো প্রলয়ের প্রতীক নটরাজ শিব (ধ্বংসের দেবতা), কখনো সৃষ্টির প্রতীক ঈশান (সৃষ্টির দেবতা), আবার কখনো বিদ্রোহী বীর চেঙ্গিস খান।  কবির এই ‘আমি’ ভালো-মন্দ, সুন্দর-অসুন্দর, সৃষ্টি-ধ্বংস সবকিছুর মিশ্রণ। এর মাধ্যমে কবি দেখাতে চেয়েছেন যে, মানুষের ভেতরের শক্তি এমনই সর্বগ্রাসী যে, সে একাধারে শান্ত আবার ভয়ংকর, সুন্দর আবার কঠোর হতে পারে।

২. পরাধীনতা ও শোষণের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ:  কবিতাটি রচিত হয়েছিল যখন ভারতবর্ষ ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনে ছিল। তাই এই ‘বিদ্রোহী আমি’ সমস্ত পরাধীনতা, শোষণ, বৈষম্য এবং অবিচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছে।  কবি ঔপনিবেশিক শক্তির অত্যাচারের বিরুদ্ধে, জীর্ণ ও সেকেলে সমাজ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে, এবং ধর্মীয় কুসংস্কারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছেন। এই বিদ্রোহের উদ্দেশ্য হলো মানবতার প্রতিষ্ঠা এবং অসাম্প্রদায়িক সমাজ গঠন করা।

See More  জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় অনার্স উপবৃত্তির নোটিস আবেদনের নিয়ম ২০২৬

৩. সাম্য, মুক্তি ও শান্তি কামনা:  বিদ্রোহীর ভূমিকা এখানে কেবল ধ্বংসের নয়, বরং নতুন সৃষ্টির জন্য পথ তৈরি করা। কবি বলেছেন, এই বিদ্রোহ থামবে যেদিন “উৎপীড়িতের ক্রন্দন-রোল আকাশে-বাতাসে ধ্বনিবে না” এবং অত্যাচারীর খড়্গ সেদিনই থেমে যাবে।  এই ‘আমি’ সকল বঞ্চিত, নিপীড়িত, অত্যাচারিত মানুষের প্রতিনিধি। এই ‘আমি’-এর চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো সত্য, সুন্দর ও সাম্যের এক জগৎ প্রতিষ্ঠা করা, যেখানে কেউ কারও দ্বারা শোষিত হবে না এবং সবাই স্বাধীনতার স্বাদ পাবে।

৪. ঐতিহ্য ও পুরাণের ব্যবহার:  কবিতাটিতে কবি ভারতীয় ও পশ্চিম এশীয় পুরাণ এবং ইতিহাসের বহু চরিত্রের নাম এনেছেন (যেমন ভৃগু, ধূর্জটি, ইস্রাফিলের শিঙা, অরুণ সারথি, চেঙ্গিস ইত্যাদি)। এটি শুধু অলংকার হিসেবে ব্যবহৃত হয়নি, বরং এই চরিত্রগুলোর ভেতরের অগ্নিশক্তিকে প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করে কবির ‘বিদ্রোহী আমি’-এর শক্তিকে আরও শক্তিশালী করে তুলেছে।

এক কথায়, ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটি হলো ব্যক্তির স্বাধীনতা, সাম্য এবং আত্ম-উত্থানের এক বলিষ্ঠ ঘোষণা। এটি শুধু রাজনৈতিক মুক্তি নয়, মানুষের মনের আধ্যাত্মিক মুক্তিরও ইঙ্গিত দেয়। কবি দেখাতে চেয়েছেন, মানুষের ভেতরের এই প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাস থাকলে সে অসম্ভবকেও সম্ভব করতে পারে এবং সমস্ত অন্যায়-অত্যাচারের অবসান ঘটিয়ে এক নতুন, সুন্দর বিশ্ব গড়তে পারে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *